নটে গাছটি মুড়লো
বেশ অনেক বছর আগের কথা বলছি হঠাৎ করেই মনে হলো তাই লিখছি।
বন্দনা কে প্রায়শ- ই আসতে হতো যাদবপুর।কারণ সেখানে তখন তার বাপের বাড়ি । এই রকমই একদিন বন্দনা বাসে চলেছে গন্তব্য যাদবপুর। তার পাশের সিটে এক ভদ্রলোক খুব সুদর্শন চেহারা বছর পাঁচেকের বড় হবেন বসলেন।একটা ভালোলাগা বন্দনার মধ্যে কাজ করছিল ভদ্রলোককে দেখার পর থেকে। অনেকক্ষণ ধরে বন্দনা বাইরে জানলার দিকে তাকিয়ে বাইরেটা দেখছিল । উনি কথা শুরু করলেন "আপনি কত দূর চললেন"?
উত্স: গুগলবন্দনা খানিকটা ইতস্তত করে বললো বাসটা যে সীমানায় শেষ হবে। উনিও হেসে বললেন আমারও গন্তব্য তাই।
ভদ্রলোক আবারও জিজ্ঞাসা করলেন
"আপনি কি চাকুরীরতা"
বন্দনা বললো," হ্যাঁ আমি পোস্ট অফিসে চাকরি করি"। তা থাকা হয় কোথায়?
হ্যাঁ চাকরি যখন করি তখন তারই কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা।
তাই তো জিজ্ঞাসা করছি আপনাকে," আপনি কোন জায়গায় চাকরি করেন"?
কেন বলুন তো? জায়গার নাম যদি আপনাকে না বলি তাহলে কি আপনার বিশেষ অসুবিধা হবে। চেনা নেই, জানা নেই,আপনাকে আমি সব কথা বলতে যাব কেন মশাই? একটু বিরক্তির সঙ্গে বলে বন্দনা।
প্রথম থেকেই যদি আপনি এই রকম মেজাজে কথা বলেন , একটু চুপ করে থেকে বললেন বন্দনার সহযাত্রী ভদ্রলোক। আসলে আজকাল মানুষ মানুষের সাথে মিশতেই চায় না। এটা হয়ে গেছে সবচেয়ে বড় সমস্যা মানুষের জীবনে। যতই ভাবি না কেন যে মানুষ সমাজবদ্ধ জীব কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের জীবনে কোন না কোন ভাবে একাকীত্ব গ্রাস করে ফেলছে। বিশ্বাস নামক বস্তুটা আমাদের প্রত্যেকের জীবন থেকে মুছে গেছে। জীবনের অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে প্রত্যেকটা মানুষই এখন ক্লান্ত, অবসন্ন আপনার আমার মতো।
কথাগুলো বন্দনার অস্তিত্ব কে যেন নাড়িয়ে দেয় । বন্দনা বুঝতে পারে যে বড় বেশি রুঢ় ব্যবহার করা হয়েছে। যা একেবারেই কাম্য ছিল না। বন্দনা ছিল ডিভোর্সি । যার সাথেই পরিচয় হোক না কেন, সব সময় বন্দনা চেষ্টা করতো একটা গণ্ডির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে। যাতে তার অতীতকে নিয়ে কোন কথা না উঠে। এবার বন্দনা খানিকটা সহজ হওয়ার চেষ্টা করে মুচকি হেসে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন যে আসলে আজকাল কেউই তো আর কারোর কথা সেভাবে শুনতে চায় না , আর যারা শুনতে চায় তাদের কোন বিশেষ উদ্দেশ্য আছে একথা আমাদের মনের গভীরে ঢুকে গেছে। এখন কেউ বেশি প্রশ্ন করলেই আমরা তাকে সন্দেহের তালিকায় দিয়ে ফেলি, আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। বন্দনা সহজ হওয়ার চেষ্টা করে।
বন্দনা জানতে না চাইলেও ভদ্রলোক তার অতীত জীবনের কথা বলতে থাকেন । বলেন আমি খুব সুখী ছিলাম বিবাহিত জীবনে, যেন লটারি পেয়েছিলাম ববিতাকে পেয়ে । কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন সহ্য হয়নি বিধাতার কাছে। বছর পাঁচেক সংসার করার পর ববিতা আর আমি একদিন ছাদে গিয়ে গল্প করছি হঠাৎ থানা থেকে ফোন করলো যে এক্ষুনি আপনাকে একবার কেসের ব্যাপারে আসতে হবে ।আমি ববিতাকে বললাম যে রাত্রে আর ফিরতে পারবো কিনা জানিনা। তুমি টুকুন ( আমার মেয়ে)কে নিয়ে খেয়ে ঘুমায়ে পড়ো।আমার আসতে ভোর হয়ে যেতে পারে একটা রেট আছে। ববিতা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতি জানায়।
উত্স: গুগলপরের দিন সকাল ৮ঃ০০ টায় বাড়ি এলাম। ক্লান্ত থাকার দরুন ববিতার দিকে না তাকিয়ে স্নান সেরে চা জল খাওয়ার খেয়ে শুয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙ্গে দুপুর তিনটের সময়। দেখি ববিতা না খেয়ে আমার জন্য বসে আছে। ববিতার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি ওকে যেন ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখি জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। কোনরকমে খাওয়া দাওয়া সেরে ববিতাকে নিয়ে ছুটি ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তারের ওষুধ খেতে থাকে কিন্তু জ্বর কিছুতেই কমে না। ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ায় ওকে হাসপাতালে দিতে বাধ্য হই। যেদিন হাসপাতালে ভর্তি হয় তার পরদিনই ববিতা মারা যায়। অজানা জ্বর ববিতাকে ছিনিয়ে নেয় আমায় ও টুকুনের কাছ থেকে। শোক সাগরে ভাসিয়ে ববিতা চির বিদায় নেয়। টুকুনের তখন মাত্র তিন বছর বয়স। কি অদ্ভুত ব্যাপার ঠিক এই বয়সেই আমিও মাতৃহারা হই। বাবা মাকে ভুলার জন্য সারাদিন ব্যবসার কাজে বাইরে থাকতেন আর আমি থাকতাম আমার দিদা দাদুর কাছে। এ যেন সে ঘটনারই পুনরাবৃত্তি।
এরপর আমি আমার চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাবার ব্যবসার কাজ দেখা শোনার জন্য মনোযোগী হলাম এবং বাবাকে পুরোপুরি অবসর দিলাম। এই অবসর সময় বাবা সব সময় টুকুনের সঙ্গে সময় কাটাতেন। টুকুন ছিল আমার বাবার চোখের মণি। আমিও ঠিক আমার বাবার মত ববিতাকে ভোলার জন্য ব্যবসার কাজে সারাদিন নিজেকে ব্যস্ত রাখতাম। টুকুনকে আদর করা ছাড়া বাবা হিসেবে আর কোন দায়িত্বই আমি পালন করতাম না। সব দায়িত্বই আমার বাবার হাতে অলিখিতভাবে সঁপে দিয়েছিলাম ।
এইভাবে ষোলটা বছর কোথা দিয়ে যেন কাটিয়ে ফেললাম । আমার সেই ছোট্ট মেয়ে সময়ের সাথে সাথে বড় হয়ে যাদবপুরে ভর্তি হল ইংলিশে অনার্স নিয়ে। আজ চলেছি সেই মেয়ের সাথে দেখা করবো বলে তারই হোস্টেলে। উনার প্রত্যেকটা কথা বন্দনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এতক্ষণ শুনছিল। ভদ্রলোক বলে উঠলেন আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে আর একটা মাত্র স্টপেজ বাকি ।
"আমার গল্পটি ফুরোল
নটে গাছটি মুড়লো"।
বন্দনা বলে ওঠে "আর আপনার বাবা, নাতনিকে ছেড়ে এখন কেমন আছেন"?
ভদ্রলোক জানলার বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেন,
" তিন বছর আগে উনিও আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অমৃত লোকে"।
বন্দনা এই উত্তরের জন্য প্রস্তুত ছিল না ।খানিকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় বন্দনা বলে" ঈশ্বর আমাদের পাঠিয়েছেন পৃথিবীতে, প্রত্যেককেই কোন না কোন হোমওয়ার্ক দিয়ে। যখন যার কাজ শেষ হয়ে যায় তখন তাকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয় অনন্তলোকে। মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় কিন্তু অমর থেকে যায় কেবল তার সৃষ্টিকর্ম"।
✍️ মন্দিরা সিনহা
#Chottogolpo #trending #banglagolpo #reading


Comments
Post a Comment