চৌধুরী পরীবার


উৎস : Google

কুনাল চৌধুরী, শিল্পপতি কেতকি চৌধুরীর একমাত্র ছেলে। পড়াশোনায় মোটামুটি ভালই। মেধাবৃত্তির জন্য নয়, খানিকটা পয়সার জোরে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে একেবারে বকে যায়। মদ, গাঁজা ,জুয়া ,সাট্টা কোন কিছুই  বাদ থাকে না, এমনকি নারী সঙ্গ। বিদেশের পড়া শেষ করে কুনাল ফিরে আসে দেশে এবং বাবার ব্যবসায় যোগ দেয়। বাবার কোম্পানির  CEO  পদে। যোগ দেওয়ার পর থেকে নিজেদের ব্যবসায়  ভুল সিদ্ধান্তের জন্য ব্যবসা মার খেতে থাকে। প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে যায় অন্যান্য কোম্পানিগুলি থেকে। এই নিয়ে বাবার সাথে ছেলে কুনালের তর্ক বেঁধে যেত প্রতি পদে, প্রতি মুহূর্তে। একদিকে ব্যবসার মন্দা অপরদিকে ছেলে কুনালের নানান রকম নেশা এবং নারী সঙ্গে টাকা ওড়ানো সব কিছু মিলিয়ে চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রির কর্ণধার কেতকি বাবুর নাজেহাল অবস্থা। কেতকি বাবু স্ত্রী মিতালীর কাছে এই নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।   কি ভেবেছিলাম আর কি হয়ে গেল ।ছেলে আমার বিদেশের ডিগ্রী নিয়ে এলো ঠিকই , তার সঙ্গে অন্য কতগুলো বদগুণ নিয়ে এদেশে ফিরে এলো । আমার ব্যবসার পক্ষে যা ক্ষতিকারক। কোম্পানির রমরমা ব্যবসা যে ভীষণভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে তা ভেবে ভেবে কেতকী বাবু অসুস্থ হতে থাকেন। অনেক ডাক্তার দেখানো, অনেক রকম টেস্ট করার পরও বোঝা যায় না যে উনি কেন বারে বারে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাই ডাক্তার বন্ধুরা বলেন এ তোমার মনের রোগ ।তুমি বাড়িতে ছেলের বউ নিয়ে এসো ,ছেলেকে যদি ঠিক পথে আনতে হয়। এমন মেয়ে নিয়ে আসো যে তোমার ব্যবসার হাল ধরতে পারবে। কেতকি বাবুর ডাক্তার বন্ধুদের মধ্যে ডক্টর সরকার নিজের বিধবা বোনের কন্যার জন্য কুনালের সাথে সম্বন্ধের প্রস্তাব দেন। আরো বলেন তোমাদের সাথে আর্থিক দিক থেকে ওদের কোন সামঞ্জস্য নেই। কিন্তু মেয়ে পড়াশোনাতেও ভালো দেখতে শুনতেও ভালো। বাকি তোমার যদি পছন্দ হয় শাঁখা সিঁদুর দিয়েই মেয়েকে আনতে হবে এ বাড়িতে। যদি তুমি রাজি থাকো এই প্রস্তাবে তাহলে আমি আমার বোনকে জানাতে পারি। কেতকী বাবু নিজের ছেলের জন্য যেন স্বর্গ পান। কেননা যার এত নেশা রয়েছে অবস্থাপন্ন বাড়ির কেউ ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা ভাববে বলে মনে হয় না। 


কেতকি বাবু মিতালী দেবীর সাথে আলোচনা করে ডক্টর সরকারের বাড়িতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন উনার ভাগ্নীকে দেখার জন্য। যথা সময় মেয়ে দেখতে যান চৌধুরী বাবু, মিতালী দেবী। কথাবার্তা বলার পর চৌধুরী বাবু ডক্টর সরকার ও ওনার বোন শকুন্তলা দেবী কে বাড়িতে আসার জন্য অনুরোধ জানান। চৌধুরী বাবুর বাড়িতে এসে  খুব ভালো লাগে ওনাদের আন্তরিকতা দেখে। এত বৈভব থাকার পরও এত সুন্দর ব্যবহার শকুন্তলা দেবী কে মুগ্ধ করে।কিন্তু  ছেলে কুনাল না থাকার জন্য তাকে দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হন। এরপর ছেলে ও মেয়ের একসাথে কথাবার্তা যাতে হয় দেখা সাক্ষাৎ এর মাধ্যমে তার কথা বলেন শকুন্তলা দেবী। চৌধুরীবাবু প্রথমে নিমরাজি ছিলেন। কিন্তু শকুন্তলা দেবীর জোড়াজুড়িতে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট দিনে ছেলে এবং মেয়ে দেখা করার কথা ঠিক হয়। ছেলে কুনাল ও মেয়ে জয়িতা দেখা করে একটি রেস্তোরাঁয়। দুইজনের সম্মতিতে বিয়ের দিন পাকা হয়ে যায়। ডক্টর সরকার বোনকে ছেলের বদ গুন কোনটাই লুকায় নি।তারপরও শকুন্তলা দেবী এই বিয়েতে কোনরকম আপত্তি করেননি। বলেন আমার মেয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। বিয়ের আগে ওরকম বড়লোক ছেলেদের একটু আধটু বদগুণ থাকেই। দিনক্ষণ স্থির হলে কেতকী বাবু একান্তে জয়িতার সাথে কথা বলেন। ছেলের গুনাবলী সহ জয়িতা যাতে আরো পড়াশোনা চালিয়ে যায় তার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ছেলেকে ঠিক পথে আনার জন্য আর কি কি প্রয়োজন সবই তিনি আলোচনা করেন জয়িতার সম্মতি সাপেক্ষে। 


              উৎস : Google

মঙ্গল শঙ্খ ও মাঙ্গলিক সানাইয়ের সুরে সুর মিলিয়ে দেবগুরু ঋষি প্রজাপতির আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে অগ্নিনারায়ণ কে সাক্ষী রেখে কুনাল জয়িতা সাত পাকে বাঁধা পড়ে। আনন্দের আতিশয্যে ভেসে না গিয়ে জয়িতা চোখ কান খুলে চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ করে। বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর জয়িতা ফুলশয্যার খাটে গোটা রাত একা কাটাতে বাধ্য হয়। সারা রাতেও কুনালের দেখা পাওয়া যায় না। এরপর থেকে সকালবেলা কুনালের দেখা পাওয়া গেলেও রাত্রিবেলায় কোনদিনই জয়িতা কুনালকে কাছে পায় না। সকালের দিকে একটু আধটু কথা কুনাল বলার চেষ্টা করে জয়িতার সাথে, কিন্তু জয়িতা কোন কথারই উত্তর দেয় না।  কুনালকে বিশেষ পাত্তাই দেয় না।  কুনালের দৃষ্টি এড়ায় না, যে জয়িতা তার প্রতি  অনুরক্ত নয়। সুদর্শন পুরুষ যেখানে মেয়েরা তার প্রেমে পাগল সেখানে জয়িতা তার মুখের দিকেই তাকায় না। ভালোমতো কথার উত্তর দেয় না। এই অবজ্ঞা কিছুতেই কুনাল মেনে নিতে পারে না ।একদিন সে জয়িতার  পথ রুদ্ধ করে দাঁড়ায় এবং বলে  তুমি আমার বিবাহিত স্ত্রী। তোমার কাছ থেকে যেটা আশা করি সেটা তুমি আমাকে দিতে বাধ্য। জয়িতা সাথে সাথেই বলে আমি তোমার কেনা সম্পত্তি না, যে তুমি  যেমন ইচ্ছা  আমাকে ব্যবহার করবে। আগে নিজে ঠিক হও তারপর আমার মত মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখো আমার মনের সিংহাসনে তুমি জায়গা পাও কিনা। কুনাল নেশাগ্রস্থ থাকায় জয়িতার কথায় কর্ণপাত না করে তাকে বলপূর্বক আলিঙ্গন করতে চাইলে জয়িতা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় কুনালকে। এত কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিল না কুনাল।


এইভাবে মাস ছয়েক কাটার পর যখন কুনাল কিছুতেই এই বদ নেশাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলো না তখন কুনালের বাবা চৌধুরী বাবু জয়িতাকে MBA পড়ার জন্য অন্যত্র পাঠান। প্রসঙ্গত বলে রাখি MBA পড়ার জন্য যে এন্ট্রান্স Common Admission Test (CAT) দেওয়া হয় সেই পরীক্ষা তে জয়িতা সসম্মানে উত্তীর্ণ হয় শ্বশুর বাড়ি থাকাকালীন।দীর্ঘ দুই বছর পড়াশোনা করে জয়িতা ভালোভাবে MBA ডিগ্রি পেয়ে চৌধুরী বাড়িতে ফিরে আসে। চৌধুরি বাবু জয়িতাকে ইন্ডাস্ট্রির উচ্চ পদে নিয়োগ করেন। এই দু বছরে কুনাল জয়িতাকে পাওয়ার নেশায় মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু জয়িতা কোথায় পড়তে গেছে মা-বাবার কাছে তা কিছুতেই জানতে পারে না ।ফোনালাপে জয়িতা কোন রকম ভাবেই কুনালকে জানায় না যে সে কোথায় আছে। এদিকে জয়িতা ফিরে এসে চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দিয়েছে একথা কুনালের অজানা থাকে। তাই সে যখন কোম্পানিতে যায় তখন জয়িতাকে চেম্বারে দেখতে পেয়ে চমকে ওঠে । কুনাল জয়িতার সাথে কথা বলতে চাইলে জয়িতা অফিসে কোন কথা হবে না বলে।  কথা হবে  বাড়িতে, অফিসের নিয়ম কানুন মেনে চলা উচিত।

এই নিয়ে কুনাল বাড়িতে মা-বাবার সাথে প্রচুর অশান্তি করেও কোনরকম ভাবে সুবিধে করতে না পারায় খানিকটা হতাশা গ্রস্ত হয়ে পড়ে। মা-বাবার প্রশ্রয়  জয়িতা এইরকম জায়গায় পৌঁছেছে, তা বুঝতে কুনালের অসুবিধা হয় না। তাই জয়িতার সাথে ভালো মানুষের অভিনয় মেতে ওঠে কুনাল।সবসময় জয়িতাকে যেন চোখে হারাচ্ছে এরকম ভাব করতে থাকে এবং তার সাথে বেশিরভাগ সময় কাটাতে থাকে। ঘরে এবং অফিসে। এরপর কুনাল ও জয়িতার মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক গতি পায়। জয়িতার সাথে যত মিশতে থাকে কুনাল, ততই নিজের সমস্ত ভুলগুলো বুঝতে পারে এবং অভিনয় থেকে সত্যি সত্যি জয়িতার প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে। জয়িতার মতো মেয়ে কুনালের জীবনে পরশ পাথর হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে কুনাল সমস্ত বদ সঙ্গ থেকে নিজেকে একটু একটু করে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে থাকে ।অফিসে  ভুল সিদ্ধান্তগুলোর জন্য অনুশোচনা এবং সাথে সাথে ইন্ডাস্ট্রিকে কিভাবে আরো উন্নত জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায় তাই নিয়ে জয়িতার সাথে আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে রাতের পর রাত কুনালের ।এইভাবে দুজনে সহযোগিতায় চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রি তার আগের গৌরব ফিরে পায়।  কেতকি বাবু এবং মিতালী দেবী দুজনেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে জয়িতাকে ধন্য ধন্য করতে থাকেন।

🖋️ মন্দিরা সিনহা

#ChottoGolpo #bengali #reading

Comments

Popular posts from this blog

মুস্কিল আসান

অনাত্মীয়