বন্ধু

 বীরেন চ্যাটার্জি জাঁদরেল উকিল। ক্রিমিনাল কেসে সিদ্ধহস্ত । কেস উনার হাতে একবার গেলে কোর্টে জয় অনিবার্য। খুব সুন্দর কেস স্টাডি করে উনি অপরপক্ষকে নিজ কায়দায় বেকায়দায় ফেলার ওস্তাদ।  স্ত্রী নন্দিনী বাড়িতে ও বাইরে সমানভাবে কাজে দক্ষ। একটি কলেজের অধ্যাপিকা ও বটে।  ওনারা দুজন ছাড়া বাড়িতে আছেন বীরেন চ্যাটার্জির মা, বাবা ও একমাত্র ছেলে প্রেমাংশু। বাড়ির নিচে সম্পূর্ণ পৃথক একটি ঘরে যেহেতু ওনার চেম্বার সেই কারণে বহু লোকের যাতায়াতে সরগরম থাকতো  বসতবাড়ি। বসতবাড়ির মধ্যে থেকেও একদম আলাদা ছিল উকিল বাবুর চেম্বার। কেউ চেম্বারে এলেও বাড়ির ভেতরে কি হচ্ছে তা বুঝার কোন অবকাশই ছিল না। একবার উকিল বাবু চেম্বারে চলে গেলে কোন প্রয়োজনীয় কথা থাকলেও ফোন ছাড়া উনার কাছে যাওয়ার অনুমতি ছিল না।

নন্দিনীর সারাদিন কর্মব্যস্ততার মধ্যেই কাটতো ঘরে বাইরে,ফুরসৎ পাওয়ার সময় ছিল খুবই কম। তার মধ্যেও বীরেন বাবুর সাথে সারাদিনে রাত আটটার পর কথা বলার সুযোগ হতো।  আধঘন্টা আলাপ চারিতার মাধ্যমে দুজন দুজনের অনেক কাছাকাছি আসবেন এবং সমস্ত রকম সাংসারিক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতেন। এইভাবেই একটি সুমধুর সম্পর্ক দুজনের মধ্যে ছিল। ছেলে প্রিয়াংশু অত্যন্ত মেধাবী এবং শান্ত স্বভাবের থাকার জন্য তাকে নিয়ে নন্দিনীকে কখনো অসুবিধায় পড়তে হয়নি। বৃদ্ধ শ্বশুর, শাশুড়ি নন্দিনীর উপরে নির্ভরশীল ছিলেন এবং চাকরির সূত্রে দুজনই ছিলেন পেনশন ভোগী। নন্দিনীর বাড়ির সব কিছুর দিকেই ছিল কড়া নজর। এইভাবে সাংসারিক জীবনে নন্দিনী এবং বীরেন বাবু পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে বেশ ভালই কাটাচ্ছিলেন। 

কিন্তু হঠাৎ করে উনাদের দাম্পত্য জীবনে ঝড় নেমে আসে। ইদানিং নন্দিনী বীরেন বাবুর সাথে যখন কথা বলতেন তখন বীরেনবাবু এতটাই অন্যমনস্ক থাকতেন যে নন্দিনীর কথার ঠিকমত উত্তর দিতেন না।তাতে নন্দিনী অত্যন্ত বিরক্ত হতেন এবং দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি, তর্ক চলতো।  এদিকে বীরেন বাবু ফোনে সব সময় ব্যস্ত থাকতেন, কার সাথে যেন উনি কথাবার্তা বলতেন প্রায় সময় ।এটা নন্দিনীর দৃষ্টি এড়ায় না। একদিন বীরেন বাবুর ফোনটা হাতে নিয়ে কললিস্ট ঘেঁটে দেখেন একটি নাম্বার থেকে বারেবারে ফোন আসে। নাম্বারটা নিজের মোবাইলে সেভ করে নেন নন্দিনী।

সাংসারিক জীবনের শান্তি ফেরানোর জন্য নন্দিনী বীরেন বাবু যতই অন্যমনস্ক হন না কেন স্বাভাবিক ছন্দে কথা বলার চেষ্টা করতেন এবং বোঝার চেষ্টা করতেন বীরেন বাবুর সমস্যাটা কোথায়? কিন্তু কোন সময় বীরেন বাবুর কাছ থেকে কোন ক্লু উনি আদায় করতে পারতেন না, বাড়েবাড়েই ব্যর্থ হতেন। এইভাবে নন্দিনীর মনের উপর চাপ বাড়তে থাকে। একদিন কলেজে গিয়ে নন্দিনী স্টাফ রুমে মাথা নিচু করে বসে আছে, এমন সময় বন্ধু হৈমন্তী পিঠে হাত দিয়ে বলে,

 "কিরে, শরীর খারাপ নাকি? মাথা নিচু করে বসে আছিস যে ?তোর এখন ক্লাস আছে তো"। হৈমন্তী যেহেতু নন্দিনীর অন্তরঙ্গ বন্ধু তাই একথা শোনার পর

 নন্দিনী হৈমন্তীর হাত চেপে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে ।হৈমন্তী খানিকটা নিজেকে সামলে নিয়ে নন্দিনীকে জড়িয়ে ধরে বলে "কি হয়েছে"? হৈমন্তী নন্দিনীর বড় কাছের বন্ধু হওয়ার দরুন দুজন দুজনের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এমনকি সাংসারিক বিষয় নিয়েও আলোচনা করতো। নন্দিনী পরে  তোর সাথে কথা হবে বলে চলে যায় ক্লাস করতে। সেই দিন সন্ধ্যেবেলা নন্দিনী হৈমন্তীর বাড়িতে যায়। সব কথা শোনার পর হৈমন্তী কিছুটা সময় চেয়ে নেয় নন্দিনীর কাছ থেকে।


এক একটা দিন নন্দিনীর কাছে মনে হতে থাকে এক একটা বছরের সমান। কেননা নন্দিনী বীরেন বাবু যখনই কাছে আসতেন মনে মনে রাগে ফেটে পড়তেন কিন্তু ওপরে তা প্রকাশ করতে পারতেন না হৈমন্তীর কথা মাথায় রেখে।

ঠিক সাত দিনের মাথায় হৈমন্তী নন্দিনীকে জানায় বীরেন বাবু তার জুনিয়র উকিল তুলিকার সাথে অবৈধ প্রেমে লিপ্ত হয়েছেন। এই  কারণবশতঃ উনার কর্মজগতে তার প্রভাব পড়ছে। কেসগুলো ভেবেচিন্তে লড়তে না পারার জন্য বহু কেস উনার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।আর তুলিকা এমন একজন মহিলা যে যাদের খ্যাতি প্রতিপত্তি বেশি সেই সমস্ত মানুষদের সাথে মেলামেশা করে খোলাখুলি ভাবে। বীরেন বাবু ছাড়াও এই তালিকায় আরেকজন রয়েছেন যিনি ব্যবসা ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার অধিকারী। এই কথা শোনার পর নন্দিনীর চোখ নিজের অজান্তেই জলে ভরে ওঠে আর কিছুটা হতাশার সুরে বলতে থাকেন  "এবার উপায় কি হবে বন্ধু"? 

হৈমন্তী বলে "আমি লোক লাগিয়েছি। চিন্তা করতে হবে না। যখনই বীরেন বাবুর সাথে বা ওই ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের সাথে তুলিকা কোথাও ঘুরতে যাবে তখনই নানা রকম ছবি তোলা থাকবে আমার ভাড়া করা লোকের ক্যামেরায়"। নন্দিনী এবার বলে" তাতে আমার কি লাভ হবে"? 

লাভ হবে বন্ধু। ব্যবসায়ী ভদ্রলোক আর তুলিকার ছবিগুলো দেওয়া হবে বীরেন বাবুর হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে। বাড়িতে কোন অশান্তি না করে তুই শুধু বীরেন বাবুর সাথে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতে থাক । বাকি খেলাটা আমি দেখছি।


এরপর মনের আনন্দে নন্দিনী ঘরে বাইরে সামলাতে থাকেন এবং বীরেন বাবুর সাথে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার জারি রাখেন। বীরেন বাবু নন্দিনীর কথার সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন এবং সব সময় যেন ব্যস্ত থাকেন মোবাইলে। এরকমই একদিন রাত আটটার পর নন্দিনী ও বীরেন বাবুর যখন একান্তে সাংসারিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে ঠিক তখনই বীরেন বাবুর হোয়াটসঅ্যাপে কতগুলি ছবি আসে, যা দেখে বীরেন বাবু প্রথমে বিস্মিত হন এবং বারে বারে ছবিগুলি দেখতে থাকেন এবং মুখের নানান রকম পরিবর্তন নন্দিনী লক্ষ্য করতে থাকেন। নন্দিনী বীরেন বাবুকে বলেন "কোন কেস কি খুব জটিল আকার নিয়েছে? সেই জন্য তুমি এত চিন্তিত"।

 বীরেন বাবু বলেন" এ তো আমাদের প্রফেশনে হতেই থাকে ও নিয়ে তুমি চিন্তা করোনা"।

এই বলে কিছু না বলে উনি ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়েন। ফিরে আসেন অনেক রাত করে। সেই সময়ে নন্দিনী ও হৈমন্তীর অনেক কথাবার্তা হাসাহাসি চলতে থাকে। এই ঘটনার পর থেকে জুনিয়র উকিল তুলিকাকে বীরেন বাবুর চেম্বারে আর কখনো দেখা যায়নি।  উকিল বাবু নিজের সংসারের ব্যাপারে ও নন্দিনীর ব্যাপারে আরো বেশি যত্নশীল হয়ে পড়েন।


  হৈমন্তী হাসতে হাসতে নন্দিনীকে বলে "নিজ কায়দায় জাঁদরেল উকিলকে কিরকম বেকায়দায় ধরাশায়ী করলাম ভাবতে কেমন রোমাঞ্চ লাগছে। যাই হোক না কেন কখনোই বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়ো না ,শান্ত হয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করো তাহলে অবশেষে  তোমার জয় নিশ্চিত"।

এদিকে নন্দিনী ঈশ্বরের কাছে হাতজোড় করে নিজের কৃতজ্ঞতা জানাতে থাকেন এবং মনে মনে অনুভব করেন যে বন্ধু এরকমই হওয়া উচিত। যে বিপদে-আপদে পাশে থাকবে, ভালো বুদ্ধি দেবে এবং একজন ভালো বন্ধু থাকলেই জীবনের চলার পথের কাঁটা গুলো সরিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায় অতি সহজে। একজন প্রকৃত বন্ধু প্রত্যেকে জীবনেই থাকা উচিত। 


কিন্তু বাস্তবে সবার কপালে প্রকৃত বন্ধু থাকে না । নন্দিনী ভাগ্যবতী তাই এমন একজন প্রকৃত বন্ধু পেয়ে এত বড় বিপদ কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। 


✍️ মন্দিরা সিনহা

Comments

Popular posts from this blog

মুস্কিল আসান

অনাত্মীয়