সোস্যাল মিডিয়া
কিন্তু ফুলশয্যার রাতে অখিলেশের আচরণে মৌমিতা বুঝতে পারে যে অখিলেশ তাকে কিছু লুকোতে চাইছে। কারণ অখিলেশের মোবাইল মৌমিতার হাতে এলে অখিলেশ একপ্রকার ছিনিয়ে নেয় মৌমিতার হাত থেকে । কিছু বোঝার আগেই হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেওয়ায় মৌমিতা অত্যন্ত অপমানিত বোধ করে এবং মোবাইল কেড়ে নেওয়ার কারণ জানতে চায়। অখিলেশের কাছে এর কোন সদুত্তর না থাকায় মৌমিতা যারপন নাই বিস্মৃত হয়। অখিলেশ মৌমিতা কে একটাই অনুরোধ করে মোবাইলে হাত না দেওয়ার জন্য। মোবাইলে এমন কি আছে যার জন্য মৌমিতা হাত দিলে অখিলেশ এই রকম ছটফট করে ,সেটা ভেবে কুল পায় না মৌমিতা এবং এই সন্দেহ-ই তাকে ভালো থাকতে দেয় না বিবাহিত জীবনে। এই একটি মাত্র প্রশ্ন চিহ্ন তার বিবাহিত জীবনে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। ভেতরে ভেতরে মৌমিতা শেষ হতে থাকে। অখিলেশ ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে বিবাহ কার্য সম্পন্ন করতে এসেছিল ।অষ্টমঙ্গলায় শ্বশুরবাড়িতে কাটিয়ে আবার মৌমিতাকে নিয়ে দুদিন বাদে ফিরে আসে নিজের বাড়িতে। দুদিন পাহাড়ে মধুচন্দ্রিমা কাটিয়ে নির্দিষ্ট দিনে রওনা দেয় নিজের চাকরির স্থল গুরগাঁও।
মৌমিতা যেহেতু কলেজে পড়াশোনা করছে তাই সে থেকে যায় শ্বশুর বাড়িতে। প্রথম থেকেই শ্বশুর -শাশুড়ির ভালবাসা মৌমিতা কে আপ্লুত করে। নিজের মা-বাবার অভাব সব সময় পূরণ করার জন্য উনারা ছিলেন সর্বদা সচেষ্ট। মৌমিতা এতে ভারী লজ্জা পায়, কিন্তু উনাদের একটাই কথা ছেলে বাইরে থাকলেও তার শূন্যস্থান তুমি পূর্ণ করেছো, এতেই আমরা খুশি। মৌমিতার সব শখ আহ্লাদ, গান বাজনা ,পড়াশোনা, কোন কিছুতেই ওনারা বাধা দিতেন না বরং সব সময় উৎসাহিত করতেন। মৌমিতার গানের প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা এবং সেই সূত্রে ই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়া ছিল তার নেশা ও পেশা। মৌমিতা শ্বশুর বাড়ি ও বাপের বাড়ি একই মফস্বল শহরে হওয়ার জন্য দুই বাড়ির মা বাবা একসাথে মৌমিতার অনেক গানের অনুষ্ঠানে যেতেন। এরপর নিজের শহরের বাইরে থেকেও মৌমিতার বিভিন্ন জলসায় গান গাওয়ার আমন্ত্রণ আসতে থাকে। সেইসব অনুষ্ঠানেও মৌমিতা অংশগ্রহণ করে। মৌমিতার রোজগার বাড়তে থাকলে শাশুড়ি মায়ের সাথে আলোচনা করে বাড়িতে গানের স্কুল খোলে। দেখতে দেখতে সেখানেও ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বেশ বাড়তে থাকে। মৌমিতা গান কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। ঠিক এরকমই এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গুরগাঁও থেকে ডাক আসে মৌমিতার কাছে। মৌমিতা সানন্দে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বায়না নেয়। সেই কথা অখিলেশকে জানায় না মৌমিতা সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। বিয়ের পর মাত্র দুই বার ছুটি নিয়ে অখিলেশ এ বাড়িতে আসে। আবার আসার কথা ছিল দুর্গাপুজোর সময়। তার আগে গানের জলসার জন্য মৌমিতা শ্বশুর, শাশুড়ির সাথে পৌঁছে যায় গুরগাঁওয়ে । অখিলেশের মা বাবা অখিলেশের কোয়ার্টারে পৌঁছে যান ঠিকানা মিলিয়ে। আগেও একবার ওই কোয়ার্টারে উনারা গিয়েছিলেন অখিলেশ চাকরি পাওয়ার পর। অখিলেশের দেখতে দেখতে পাঁচ বছর চাকরি হয়ে গেল। প্রথম ওর মা- ই ছেলের কোয়ার্টার সাজিয়ে, গুছিয়ে দিয়েছিলেন। মৌমিতার সাথে অখিলেশের বিয়ে প্রায় এক বছরের কাছাকাছি হতে চললো। মৌমিতার ইচ্ছা ছিল অখিলেশের কাছে কয়দিন থেকে প্রথম বছরের বিবাহ বার্ষিকী কাটিয়ে ফিরে যাওয়া। সেই জন্যেই গুরগাঁও এর অনুষ্ঠানটা এককথায় লুফে নিয়েছিল মৌমিতা।
এখানে যেন এক বিরাট চমক অপেক্ষা করছিল মৌমিতার জন্য। দরজায় বেল দিতে এক পাঞ্জাবি অল্প বয়সী মহিলা দরজা খোলে।। অখিলেশের মা বাবা ভেতরে প্রবেশ করে, পেছন পিছন মৌমিতা ভেতরে এসে চতুর্দিক দেখতে থাকে। অখিলেশের কথা জিজ্ঞাসা করাতে পাঞ্জাবি মেয়েটি নীলম বলে অফিসে গেছে ,ফিরতে রাত হবে। নীলম হিন্দিতে ওনাদের পরিচয় জানতে চায়। অখিলেশের মা-বাবা নিজেদের পরিচয় দেন। নীলম মাথায় ওড়না টেনে ওনাদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। এরপর নীলম এর পরিচয় জানার পর অখিলেশের মা-বাবা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কথায় কথায় জানতে পারেন যে নীলমের সাথে অখিলেশ দুই বছর আগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় পাঞ্জাবি মতে। নীলম, মৌমিতার পরিচয় জানতে চাইলে অখিলেশের মা নিজের বোনের মেয়ে বলে পরিচয় দেন। এরপর আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে থেকে অখিলেশের মা-বাবা মৌমিতাকে নিয়ে গুরগাঁওয়ের এক হোটেলে ওঠেন। নীলমের অনুরোধ উপেক্ষা করে। এবার মৌমিতার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায় কেন অখিলেশ মোবাইল ফোনটা সব সময় লুকিয়ে রাখার চেষ্টায় থাকতো। এমতাবস্থায় মৌমিতা কিভাবে স্টেজ শো করবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্ধিহান ছিলেন মৌমিতার শ্বশুর - শাশুড়ি । কিন্তু মৌমিতা যথেষ্ট শক্ত থেকে নিজের ষোল আনা পারফরমেন্স দেয় স্টেজ শোতে। এরপর ফিরে আসে শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে। ফিরে এসে উকিলের সহায়তায় নিজের প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর দিন অখিলেশকে ডিভোর্সের চিঠি পাঠায় মৌমিতা।
এই অব্দি শক্ত হাতে সবকিছু করার পর মৌমিতা অবশেষে কান্নায় ভেঙ্গে পরে শাশুড়ি মার কোলে। শাশুড়ি মা যেন ভাষা হারান ,পরম স্নেহে মৌমিতাকে কাছে টেনে নেন। বলেন আমার কোন অধিকার নেই তোকে ধরে রাখার। তুই যা ভালো বুঝেছিস তাই কর। ছেলে দোষ করেছে আগের বিয়ে লুকিয়ে, যেটা আমাদের অজানা ছিল। তাই তোর ভবিষ্যৎ আমাদের অজান্তেই নষ্ট করে দিলাম ।আমাদের ক্ষমা করিস তুই মা। তোকে আজ থেকে আমি মুক্ত করলাম। তুই নিজেকে ও জীবনটা সুন্দর করে গুছিয়ে নে। তোর সামনে সারা জীবনটা পরে আছে ।আমাদের সব সময় তোর পাশে পাবি, যে কোন দরকার-ই হোক না কেন।
মৌমিতা এরপর ফিরে যায় নিজের মা-বাবার কাছে।সেখানেই ওর আগের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়েই গানের স্কুল খোলে এবং গানের জগতে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। আর অপেক্ষা করতে থাকে অখিলেশের সাথে মিউচুয়াল ডিভোর্সের জন্য।
ঠিক এই ভাবেই সোস্যাল মিডিয়ার চক্করে কতশত মৌমিতার জীবনে নিজেদের অজান্তেই ঝড় নেমে আসে। তার মোকাবিলা একমাত্র মৌমিতার মতো শক্ত এবং গুণের মেয়েরাই সামাল দিতে পারে। আর কত মেয়ে ঝরে যায় অকালে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার জন্য।
#ChottoGolpo #reading #bengali

Comments
Post a Comment