নাসির ও ফতেমা

নাসির ও ফতেমা অল্প বয়সে বিয়ে করে নিজেদের ইচ্ছায়। দুটি সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকেই তাদেরকে মেনে নেওয়া হয় না। কারণ মুসলিম হলেও দুইজনে ছিল দুই সম্প্রদায়ের। যার পরিণতিতে নাসির ও ফতেমা সম্ভ্রান্ত হওয়া সত্বেও দুই বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে নিজেদের মতো সংসার করতে থাকে। কয়েক বছর সংসার করার পর , সংসার যখন বাড়তে থাকে, তখন আর্থিক অনটনের জন্য কলকাতা খিদিরপুর এলাকায় খুব কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকা শুরু করে। নাসির খিদিরপুর ডকে ক্লাস ফোর স্টাফ হিসাবে যোগ দেয় ,তার সাথে সাথে ইউনিয়ানে সাথে যুক্ত হয়। বিয়ের পরে হায়দ্রাবাদে থাকতো নাসির ও ফতেমা। কিন্তু এক ছেলে ও দুই মেয়ে হওয়ার পর খুব কষ্টে শিষ্টেও সংসার চালানো সম্ভব না হওয়ার জন্য সপরিবারে কলকাতায় চলে আসে।
একবার নাসির ও ফতেমা দুইজন মিলে খিদিরপুরে মাজারে সিন্নি চরাতে আসে। মাজারে ফতেমা খুব ভালো মতো আল্লাহকে স্মরণ করে যখন বাইরে আসে তখন এক ফকিরকে দেখতে পায়। ফকির প্রসাদ চায়, ফতেমা তাকে যত্ন করে প্রসাদ দেয় আর সেই ফকির এক টাকার নোট ফতেমার হাতে দিয়ে যত্ন করে রাখতে বলে। ফকিরের হাত থেকে এক টাকা পেয়ে ফতেমা খানিক বিস্মিত হলেও খুব যত্ন করে নিজের কাছে টাকাটা আল্লাহর নামে স্মরণ করে বাড়ি নিয়ে আসে। এরপর টাকাটা ছবি যেরকম বাঁধানো হয় ঠিক সেই রকম ভাবে বাঁধিয়ে নিয়ে আসে দোকান থেকে। প্রত্যেকদিন সেই বাঁধানো টাকায় ধূপ দিয়ে নিজের মনস্কামনা জানাতে থাকে।
এরপর থেকে ম্যাজিকের মত সংসারের উন্নতি শুরু হয়। নাসির উত্তরোত্তর উন্নতি করতে থাকে খিদিরপুর ডকে এবং ইউনিয়নের লিডার হয়। বহু মানুষ খিদিরপুর ডকে নাসিরকে সম্মান ও খাতির করে চলতো । এক বাক্যে নাসিরকে সবাই চিনতো খিদিরপুর ডকে, ধীরে ধীরে খিদিরপুরে জায়গা নিয়ে বিরাট বাড়ি তৈরি করে নাসির। তখন নাসিরের প্রভাব প্রতিপত্তি তুঙ্গে বিরাজ করছে। ছেলে মেয়েদের ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা শেখানোর পাশাপাশি খেলাধুলা ও গান বাজনাতেও পারদর্শী করতে থাকে।
এরপর সোনারপুরে দশ কাটা জায়গার উপর ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি করে। যেখানে ছটা ফ্যামিলি ভালো মতো থাকতে পারবে এবং তার সাথে একটা বিরাট বাগান। যে বাগান ফুলেফলে ভর্তি থাকতো সবসময়। বাগানের সৌন্দর্য সব সময় বজায় রাখতে দুইজন মালিকে নাসির রেখেছিল। এই ফ্ল্যাট বাড়ি প্রত্যেকটা অংশই সব সময় ভাড়া থাকতো এবং একজন ভাড়াটে উঠে গেলে ঠিক আরেকজন ভাড়াটে পাওয়া যেত। কোন অসুবিধায় কখনো হতো না । এই ফ্ল্যাট তৈরি হওয়ার ঠিক দশ বছর বাদে ফ্ল্যাটে অল্প বয়সী একটি ছেলে (বিকাশ) ও তার স্ত্রী (মিতা)ভাড়া আসে। তখন নাসির মধ্যবয়স্ক। বড় মেয়ে নাজমা পড়াশোনা শিখে তখন বিয়ে হয়ে গেছে এবং ছেলে চাকরির জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে আর ছোট মেয়ে পড়াশোনা করছে।
বিকাশ ও মিতা দুজনেই ছিল হিন্দু বাঙালি। ব্যবসায়িক কারণে এই ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া। মিতা খুব ঈশ্বর ভক্ত ছিল ।সব সময় মনে মনে ঈশ্বর স্মরণ করতো এবং পূজা অর্চনা অল্প বয়সেও দেখবার মতো করতো। ব্যবসার কারণে বিকাশকে মাঝেমধ্যে বাইরে যেতে হতো কয়েকদিনের জন্য। সেই সময় মিতা একা ওই বাড়িতে থাকতো। অনেকেই এর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে মিতাকে বিপথে চালানোর জন্য। কিন্তু খুব ভালো বাড়ির মেয়ে এবং অন্যরকম মানসিকতা হওয়ার জন্য তা করা কারোর পক্ষেই সম্ভব হয়নি। মিতা যে ফ্ল্যাটে থাকতো তার ঠিক উল্টোদিকে নাসিরের( বড় মেয়ে) নাজমা ও জামাই থাকতো, সঙ্গে তাদের ছোট ছোট ছেলে- মেয়ে। এতে মিতার কখনো কোন অসুবিধা হয়নি বরং খুব ভালো সম্পর্ক রেখে চলার চেষ্টা করতো। সময়ের সাথে সাথে নাসির খিদিরপুর ডক থেকে অবসর নেয়। অধিকাংশ দিন নাসির বড় মেয়ের কাছে আসতেন।
মিতাদের দেখতে দেখতে ওই ফ্ল্যাটে পাঁচ বছর থাকা হয়ে যায় । কিন্তু কোন ছেলে মেয়ে না হওয়ার জন্য অনেকের কাছ থেকেই কটূ কথা শুনতে হতো। বিশেষ করে নাসিরের বড় মেয়ে নাজমা তাকে নানান রকম কটূক্তি করতো। কারণ নাজমা নিজেই সব সময় মানসিক অশান্তিতে থাকতো। নিজের সংসারে শান্তি না থাকার জন্য মিতাকেও অশান্তিতে রাখার চেষ্টা করতো। কষ্টদায়ক হলেও মিতা কখনোই কিছু বলতো না এই নিয়ে। বিয়ের পরের বছর বিকাশের বন্ধুরা ফ্ল্যাটের দরজায় কার্তিক রেখে যাওয়ার জন্য মিতা তিন বছর কার্তিক পুজো করেছে ধুমধাম করে ফ্লাটে সারা রাত ধরে উপোষী থেকে। কিন্তু মিতা মা হতে পারেনি তখনও পর্যন্ত।মিতা যে ফ্ল্যাটে থাকতো তার কাছে আরেকটি মাজার ছিল। অনেকে আবার মিতাকে ওই মাজারে প্রার্থনা জানানোর জন্য পরামর্শ দিত। বলতো এই অঞ্চলে হিন্দুরাই এই মাজার টিকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং এখানে যা মনষ্কামনা করা যায়, সুতো দিয়ে ঢিল বাঁধলে সেই মনস্কামনা পূর্ণ হয়। মিতা একদিন যখন খুব মন খারাপ সেইদিন ছিল শুক্রবার সন্ধ্যেবেলায় মাজারে গিয়ে সুতো দিয়ে ঢিল বেঁধে মোমবাতি জ্বালায় ও বাতাসা প্রসাদ হিসেবে দেয়। এর মাঝখানেক পর মিতা সন্তান সম্ভবা হয় এবং যথাসময়ে পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। এই সময় বেশ কিছুদিন বাপের বাড়িতে থাকে মিতা। ছেলেকে ছয়মাসের কোলে নিয়ে আবার ফ্ল্যাটে ফিরে আসে এবং খুব বড় করে অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠান করে। বহু লোক নিমন্ত্রিত থাকে এই অনুষ্ঠানে। মিতা ও বিকাশের দুই বাড়ির মা বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে গমগম করতে থাকে অনুষ্ঠান বাড়ি। এই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কিছুদিন বাদে----
মিতার এত সুখ নাজমার সহ্য হয় না।এরপর থেকে মা ফতেমার সাথে হাত মিলিয়ে নাজমা এই ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে বিকাশ আর মিতাকে। নাসিরের এতে বেশ আপত্তি ছিল। নাসির চেয়েছিলেন ভাড়া বাড়িয়ে মিতা আর বিকাশ এই ফ্ল্যাটেই যেন থাকে।সেই মতো বিকাশের সাথে কথা বলে ভাড়া বাড়িয়ে ছিলেন । কিন্তু নাজমা ও ফতেমা এমন ভাবে মিতাকে অতিষ্ঠ করে তোলে যে বিকাশ অন্য ফ্ল্যাটে চলে যেতে বাধ্য হয়। তখন বিকাশের নিজস্ব বাড়ি তৈরি হচ্ছে। অন্তত ছ মাস থাকার অনুমতি চেয়েছিল ফতেমার কাছে। কিন্তু ফতেমা একেবারেই মিতা আর বিকাশকে এই ফ্ল্যাটে রাখতে রাজি ছিল না। কাজেই বিকাশ বাধ্য হয় অন্যত্র ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে কিছুদিনের জন্য।
বিকাশ ও মিতা ছোট পুত্র সন্তানকে নিয়ে চলে যাওয়ার এক মাস পর থেকে ফতেমাদের একটার পর একটা ফ্ল্যাট খালি হতে থাকে, কিন্তু ভাড়াটে পাওয়া যায় না। এইভাবে ছয় মাসের মধ্যে ফতেমার মেয়ে নাজমা ছাড়া ওই ফ্ল্যাট পুরো খালি হয়ে যায়। নাজমার সংসারে অশান্তি ছিল নিত্য সঙ্গী। যেকোনো কারণ নিয়ে নাজমা ও তার স্বামীর মধ্যে অশান্তি লেগে থাকতো। এই অশান্তির কথা প্রথম থেকে নাসির ও ফতেমার জানা ছিল।নাসির তাই সব সময় আর্থিক দিক থেকে নানা ভাবে সাহায্য করতেন মেয়েকে এবং নিজের সংসারে জামাই এর সাথে সবকিছু মানিয়ে নিতে বলতেন। নাজমা সব কথা মা বাবাকে জানাতো না এবং মনের দিক থেকে এতটাই ভেঙ্গে পড়েছিল যে সব ভাড়াটে চলে যাওয়ার ঠিক দুই মাসের মাথায় নাজমা, গলায় দড়ি দিয়ে ওই ফ্ল্যাটে আত্মহত্যা করে। এতে নাসির ও ফতেমা মনের দিক থেকে ভেঙে পড়ে সাংঘাতিকভাবে। ততদিনে নাসিরের ছেলে ও ছোট মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে ও মেয়ে দুইজনই চাকরির সূত্রে কলকাতার বাইরে থাকতো। এরপর ফতেমা নাজমার ছেলে ও মেয়েকে খিদিরপুরে বাড়িতে নিয়ে চলে আসেন। কিন্তু এখানেও এক অঘটন অপেক্ষা করছিল ফতেমার জন্য। নাজমার মৃত্যু নাসির কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। কি এমন হলো যে নাজমার সাথে এত বন্ধুসুলভ আচরণ করার পরও সে এই রকম একটা সিদ্ধান্ত নিল তাই ভেবে কুল-কিনারা করতে পারতো না নাসির। নাসির সব সময় ফতেমাকে দোষারোপ করতো যে মিতা ও বিকাশ চলে যাওয়ার পরই আমাদের সংসারে অলক্ষী প্রবেশ করেছে। স্বয়ং লক্ষ্মী আমাদের ঘরে বসবাস করছে তা তুমি বুঝতে পারো নি। তাই আজ আমাদের সংসারের এই ছন্নছাড়া দশা। ফতেমা ও নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাইতো। সারাদিন আফসোস করতো কেন মিতাকে এখান থেকে উঠে যাওয়ার জন্য এতটা চাপ সৃষ্টি করলাম একথা ভেবে।
এভাবে সংসারের নানা অশান্তি, ওঠা নামার মধ্যে একদিন ঘুমের মধ্যে নাসির চির বিদায় নেয়। এই দুঃখ সহ্য করা ফতেমার কাছে এতটাই কষ্টদায়ক পর্যায়ে পৌঁছায় ,(নাজমার দুই ছেলে মেয়ে থাকা সত্ত্বেও) মনের উপর এতটা প্রভাব ফেলে যে ফতেমা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে। ফতেমার ছেলে কলকাতায় চলে আসে বদলি নিয়ে সপরিবারে মায়ের কাছে। কিন্তু দিনে দিনে ফতেমা এতটাই বিকার গ্রস্ত ও পাগলামি শুরু করে যে তাকে ঘরে রাখা কঠিন হয়ে পরে। একদিন ফতেমা বটি নিয়ে বৌমার দিকে ছুটে গেলে অনেক কষ্ট করে তাকে থামাতে সমর্থ্য হয় ছেলে ফয়জুল। এবার ফয়জুল Psychologist এর অর্থাৎ মনোবিদের সাথে কথা বলে সাময়িকভাবে মাকে সুস্থ করার জন্য Mental asylum এ পাঠাতে বাধ্য হয় অনিচ্ছা সত্ত্বেও। ফতেমা হাততালি দিতে দিতে Mental asylum এ যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠে বসে এবং হাসতে হাসতে চলে যায় নিজের বাড়ি ছেড়ে। পড়ে থাকে ফতেমা আর নাসিরের বানানো নিজেদের স্বপ্নের বাড়ি, ছেলে ,বৌমা, ছেলের ঘরের ছেলে আর নাজমার ছেলে- মেয়ে। অস্থায়ী ঠিকানায় কিছুদিনের জন্য ফতেমা হাসতে হাসতে চলে গেলও চোখের জলে মাকে বিদায় দেয় ফয়জুল।
মন্দিরা সিনহা
Comments
Post a Comment