সুচেতা ত্ত সুদেষ্ণা

 


ত্রিদিব একসাথে তিনটি সরকারি পরীক্ষায় সম্মানের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে কাস্টমসের চাকরি তে জয়েন করেন। ছোটবেলার প্রাণের বন্ধু সুচেতাকে চিঠির মাধ্যমে এ কথা জানান ত্রিদিব । চাকরি সূত্রে সুচেতার বাবা বদলি হয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতেন বলে ত্রিদিব ও সুচেতা প্রাইমারি স্কুলে একসাথে পড়াশোনা করলেও পরবর্তীকালে একসাথে পড়ার সৌভাগ্য দুইজনের আর হয়নি। কিন্তু দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। এদিকে সুচেতা নার্সিং ট্রেনিং নিয়ে একটি সরকারি হাসপাতালে চাকরি শুরু করেছে ততদিনে। ত্রিদিব -এর ফোন পেয়ে সুচেতা আনন্দে ত্রিদিবকে তার সাথে দেখা করার জন্য অনুরোধ করে । কিন্তু নতুন চাকরি হওয়ার জন্য ত্রিদিবের যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও যাওয়া হয়ে ওঠে না সুচেতার কাছে। বছর দুই পর সুচেতার বাবা রিটায়া করে সুচেতার কাছে পাকাপাকিভাবে চলে আসেন সস্ত্রীক। সুচেতা তখন কোচবিহারে কর্মরতা। ত্রিদিব মুম্বাই -এ কর্মরত ।

এদিকে সুচেতার কাজের চাপ বাড়তে থাকায় এবং দায়িত্ব ভীষণভাবে বেড়ে যাওয়ায় নিজের জগৎ নিয়ে অধিকাংশ সময় থাকতে হতো। এই সময় সুচেতা ডক্টর মলয়ের সুনজরে আসে। ওটিতে সবসময় ডাক্তারদের সাথে সুচেতাকে থাকতে হতো কোন ক্রিটিক্যাল অপারেশন হলে। এদিকে আর এক নার্স সুদেষ্ণা ডক্টর মলয় কে ভীষণ পছন্দ করতো। সেটা সুচেতার জানা ছিল ।তাই ডক্টর মলয় যতই সুচেতাকে পছন্দের কথা বলার চেষ্টা করুক না কেন, সুচেতা সব সময় তা এড়িয়ে যেত, নিজেকে গুটিয়ে রাখতো। সুদেষ্ণা সাজগোজ করে সব সময় টিপটপ থাকতো। সুচেতার এই সাজগোজের ব্যাপারে সেরকম কোনো আগ্রহ ছিল না। একবার হসপিটালের এক স্টাফের বিয়েতে সুদেষ্ণা সেজেগুজে বিয়ে বাড়িতে এসে সবাইকে চমকে দেওয়ার কথা ভেবেছিল।কিন্তু সেদিন সুচেতাকে পেয়ে বসে সুদেষ্ণা কে টেক্কা দেওয়ার ইচ্ছা। সুচেতা সেদিন এতো আভিজাত্যপূর্ণ সাজে নিজেকে সজ্জিত করেছিল প্রত্যেকের চোখ বারে বারে সুচেতার দিকে গিয়ে আটকে যাচ্ছিল। ডক্টর মলয় মোহিত হয়ে সুচেতাকে দেখতে থাকেন। তা সুদেষ্ণার দৃষ্টি এড়ায় না।
সুদেষ্ণা শরীর ভালো নেই এ কথা বলে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। আর মনে মনে ফন্দি আটতে থাকে কিভাবে সুচেতাকে হসপিটালে সবার সামনে জব্দ করা যায় । সুচেতা তার বিন্দু বিসর্গ বুঝতে পারে না। সে স্বাভাবিক ছন্দে হসপিটাল এর কাজকর্ম শুরু করে। কিন্তু সুদেষ্ণা তাকে কোনভাবেই কোন কাজে সহায়তা করে না। কিভাবে বিপাকে ফেলবে সেই চিন্তায় থাকে। সুদেষ্ণা মেট্রন-এর কান ভাঙাতে থাকে সুচেতা সম্বন্ধে নানা কথা বলে।হাসপাতালের মেট্রনের (তত্ত্বাবধায়িকা) কাছে নার্সদের জবাবদিহি করতে হতো। মেট্রন মাঝে মাঝে ওয়ার্ড পরিদর্শনে আসেন। নার্সদের কাজের তদারকি করেন। মেট্রন সুচেতাকে ডেকে নানাভাবে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে থাকেন। কিন্তু কোন অসংলগ্ন কথা সুচেতার কাছ থেকে পান না। কাজে কাজই সুদেষ্ণার এভাবে সুচেতাকে হেনস্তা করা আর হয়ে ওঠে না। এদিকে সুচেতাকে কিভাবে জব্দ করবে একথা ভাবতে ভাবতে সুদেষ্ণ নিজেই কাজে নানান রকম ভুল-ভ্রান্তি করতে থাকে এবং সুদেষ্ণা সম্বন্ধে রোগীর বাড়ির আত্মীয়-স্বজন ও নালিশ করতে থাকে মেট্রনের কাছে। সুদেষ্ণার ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ ,মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না এবং ঠিক সময় ওষুধ পত্র রুগীকে দেয় না এ সমস্ত নানা কথা মেট্রন শুনতে শুনতে সুদেষ্ণার উপরে বিরক্ত হয়ে যান। সবার সামনে মেট্রন সুদেষ্ণা কে বকাবকি করলে সুচেতা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় থাকতো। ডাক্তার মহলেও এই নিয়ে গুঞ্জন ওঠে যে সুদেষ্ণা সুচেতাকে পছন্দ করে না ডক্টর মলয় কে কেন্দ্র করে। এদিকে সুচেতা তো তার বাল্যবন্ধু ত্রিদিব কেই পছন্দ করে, তাই ডক্টর মলয় কে নিজের হৃদয় স্থান দেওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। ধীরে ধীরে একথা সুচেতা সুদেষ্ণা কে জানালে সুদেষ্ণা আশ্বস্ত হয় এবং সুচেতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়।
সুদেষ্ণার ইচ্ছায় সারা না দিয়ে এর কিছুকাল পর ডক্টর মলয় অন্যত্র বদলি নিয়ে চলে যান। এদিকে ত্রিদিব কলকাতায় পোস্টিং নিয়ে চলে আসে। সুচেতা একথা জানার পর আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়ে এবং ত্রিদিব কে আমন্ত্রণ জানায় নিজের কোয়ার্টারে আসার জন্য। একদিকে সব সময় সুদেষ্ণা মনমরা হয়ে কাজ করতে থাকে আর সুচেতা প্রাণ চঞ্চল ভাবে নিজের কাজ আরো মনোযোগ সহকারে করতে থাকে। বন্ধু সুদেষ্ণা কে সব সময় নিজের কাজে ফোকাস করার কথা বলে এবং মনের থেকে সমস্ত রকম নেগেটিভিটি দূর করে নতুন উদ্যমে পথ চলার পরামর্শ দেয় সুচেতা। যে সুচেতাকে সুদেষ্ণা নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছিল সেই সুচেতা সব সময় সুদেষ্ণা কে আগলে রাখার চেষ্টা করতো। কিন্তু সুদেষ্ণা তখন প্রেমে পাগল ডক্টর মলয়ের জন্য। বাড়ির একমাত্র মেয়ে হওয়ার জন্য সুদেষ্ণার সব রকম আব্দার মেনে নিত তার মা-বাবা। সে ছিল জেদি ও একরোখা । যা কিছু চাইতো সব অতি সহজে পাওয়ার জন্য ডক্টর মলয়কেও অতি সহজে পাওয়ার বাসনা ছিল সুদেষ্ণার। কিন্তু তা না হওয়ার জন্য সুদেষ্ণা ডক্টর মলয় কে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। অনেক ভাবে ডক্টর মলয়ের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় সুদেষ্ণা। কিন্তু সুচেতা একমাত্র মেয়ে হলেও মা-বাবা তাকে সব সময় সব পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং বন্ধুদের সাথে সবকিছু শেয়ার করা, কারোর প্রয়োজন হলে তার পাশে দাঁড়ানো এগুলো ছোট থেকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সুচেতা স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে এ সমস্ত কাজ অনায়াসে করে থাকে। এইসব কাজগুলো সুচেতার একেবারে সহজাত ব্যাপার ছিল।
এদিকে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে ত্রিদিব চলে আসে সুচেতার কোয়ার্টারে। সুচেতার মা- বাবা এতদিন বাদে ত্রিদিব কে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উষ্ণ অভিনন্দনের মাধ্যমে ত্রিদিবকে ঘরে আহ্বান করেন। সুচেতা দূর থেকে সবই লক্ষ্য রাখে আর ত্রিদিব এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে তার ছোটবেলার সাথীকে। ত্রিদিব ও সুচেতা মুখোমুখি হতে বেশ কিছুক্ষণ বাক্যহারা হয়ে একে অপরকে দেখতে থাকে। তারপর বেশ কয়েকদিন ত্রিদিব ও সুচেতা একে অপরের সাথে গল্প গুজব, মেলামেশার মাধ্যমে যেন স্বপ্নের জগতে কয়েকটা দিন কাটায়। সুচেতা সুদেষ্ণার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় ত্রিদিবের। ওদের দুজনের এত ভালোবাসা সুদেষ্ণা মেনে নিতে পারে না। তাই ত্রিদিব কে সুচেতা সম্বন্ধে বলে যে ডক্টর মলয়ের সাথে সুচেতার ভালোবাসা আছে। ত্রিদিব প্রথমে বিশ্বাস করে না সুদেষ্ণার কথা কিন্তু মনের মধ্যে খচখচ করতে থাকে।
নির্দিষ্ট দিনে ত্রিদিব ফিরে যায় কলকাতায়। সুচেতা চোখের জলে বন্ধুকে বিদায় জানায়। কিন্তু সেদিন ত্রিদিবকে ভীষণ রকম অন্যমনস্ক লাগে সুচেতার। এদিকে ত্রিদিব নিজের ভালোবাসাকে গলা টিপে মেরে ফেলার আগে শেষ চেষ্টা চালায় সত্যিটা কি জানার জন্য। ত্রিদিব বুদ্ধি করে ডক্টর মলয়ের ফোন নাম্বার আগের থেকে জোগাড় করে রাখে। কথায় কথায় সুচেতার কাছে ত্রিদিব জানতে পারে ডক্টর মলয়ের পুরুলিয়ায় পোস্টিং। কাজের ফাঁকে ফোন করে ত্রিদিব ডক্টর মলয়ের সাথে কথা বলে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে নির্দিষ্ট কোন জায়গায়। তারপর নির্দিষ্ট জায়গায় দুজনের মধ্যে পরিচয় পর্ব শেষ হয়ে অনেক কথা বলার পর ডক্টর মলয়ের কাছ থেকে আসল সত্যটা জানতে পারে ত্রিদিব।
এদিকে সুদেষ্ণা ডক্টর মলয় কে না পাওয়ার হতাশা থেকে অনেক ঘুমের ওষুধ খেয়ে নেয়। সুদেষ্ণার যখন মরণ- বাঁচন সমস্যা তখন সুচেতা ডক্টর মলয়কে দোষারোপ করে কড়া ভাষায় কথা শোনাতে ছাড়ে না। ডক্টর মলয় নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেন না, চলে আসেন হাসপাতালে পরের দিন- ই। তারপর ডক্টর মলয়ের সাহচর্যে ধীরে ধীরে সুদেষ্ণা বেশ কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে। সুদেষ্ণা কে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে থাকে ডক্টর মলয়, সুচেতা এবং ত্রিদিব। এইভাবে সুদেষ্ণা -ডঃ মলয় ,ত্রিদিব - সুচেতা একে অপরের সাথে থাকার অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। আর সুচেতার মা বাবা প্রত্যেকটা পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে এই সেতু বন্ধনকে দৃঢ় করেন।
✍️ মন্দিরা সিনহা

Comments

Popular posts from this blog

মুস্কিল আসান

অনাত্মীয়