এক শীতের সকাল
ভোরবেলা ডোরবেলেরয় আওয়াজে ঘুম ভাঙলো, এত সকালে ওঠার অভ্যাস আমার কোন কালই নেই। যেমন গভীর রাত অব্দি জাগতে পারি সেরকম সকাল ৭ টার আগে বিছানা ছাড়ি না ।অতঃপর ডোরবেলের আওয়াজে খানিকটা বিরক্তি মাখানো মুখে ধীরে ধীরে এসে দরজা খুললাম। দরজা খুলে খানিক হতভম্ব হলাম। এক মাঝ বয়সী ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা ট্রলি ব্যাগ, হাত ব্যাগ নিয়ে ঢোকার অপেক্ষায়। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন
"আচ্ছা মিস্টার তালুকদারের বাড়ি এটা না"?
আমি বললাম "আজ্ঞে না"।
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, আমি বললাম
"আমার ঠিক ওপরের ফ্ল্যাটে ওনারা থাকেন"।
"ও হো, হো সকালবেলা আপনার একটু ঘুমের ব্যাঘাত হোল, সরি, সরি" বলে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেন।
আমি দরজা বন্ধ করে শুতে যাব আমার তখনো ও ঘুম মেশানো চোখ, হঠাৎ ব্যালকনির দিক থেকে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজে, আমার মন চলে গেল ব্যালকনিতে। কি হচ্ছে দেখার জন্য উদগ্রীব হলাম। এই হচ্ছে আমাদের একটা দোষ। কোথায় কি গন্ডগোল হচ্ছে, আরে হতে দাও না, সাহায্য কিছু করতে পারি, না পারি শোনা চাই। যেন শোনার পর রিপোর্ট করবো কোন খবরের কাগজের দপ্তরে।
তা যাই হোক ব্যাপারটা হলো ,ভদ্রলোকের গাছের ফুল কয়েকজন তুলে নিয়ে যাচ্ছে আর উনি খুব রেগে গিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করছেন।
"আমার বাড়ির গাছের সমস্ত ফুল নিয়ে গেলে আমি কেমন করে পুজো করি ফুল ছাড়া।"
একদম ঠিক কথা বলেছেন সত্যিই তো কিছু ফুল তো গাছে রেখে যাওয়া অবশ্যই উচিত। নিজের মনে এ কথা ভাবতে ভাবতে আবার এসে শুয়ে পড়লাম বিছানায়। বুঝতে অসুবিধা হলো না আজকে সারাদিনটা কেমন কাটতে চলেছে।
ভোরের ঘু্মে ব্যাঘাত ঘটায় একটু বেশি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার কাজের দিদিও একটু দেরী করে আশাতে সুবিধাই হলো ।মনে মনে ভাবলাম যাক ঘুম যখন ঠিকঠাক হয়েছে দিনটা মনে হয় ভালোই কাটবে। এই ভেবে চা করে ব্যালকনিতে বসে ফেসবুকে মগ্ন হলাম। ফোনে রিংটোন এর আওয়াজ পেয়ে ফোন নাম্বারটা কিছুতেই চেনা চেনা লাগলো না দেখেও অনিচ্ছা সত্ত্বে ফোনটা ধরলাম। অপরপ্রান্ত থেকে বলে উঠলো,
"এই মন্দিরা আমি স্কুলের কয়েক ক্লাস উঁচুতে পড়তাম। আমি মালবিকা দি রে। আমি পুষ্পিতার কাছে তোর নাম্বারটা পেলাম। আসলে আমার এখানে একটা কাজ ছিল আমি এসেছি। শুনলাম তুই এরই কাছাকাছি কোথাও থাকিস। তোকে দেখারও খুব ইচ্ছা হলো ,বহু বছর দেখা সাক্ষাৎ নেই। যদি অনুমতি দিস তাহলে ঠিকানাটা বললে আমি তোর কাছে যেতে পারি"।
এ আবার সকাল সকাল কি ঝামেলায় পড়লাম ।চিনি না ,জানি না আমার থেকে উঁচু ক্লাসে, হয়তো মুখ চেনা কেউ হবে, বললাম
"একটু বাদে ফোন করি তোমাকে"।
"ঠিক আছে, ঠিক আছে" বলে অপরপ্রান্ত থেকে ফোন কেটে দিল। আমার কর্তা মশাই শুনে বললেন চা খেতে খেতে "আরে ডেকেই নাও না"।
"তোমায় যে মনে রেখেছে এটাই তো যথেষ্ট। আজকাল মানুষ যা চাপে থাকে তাতে মনে রাখাটাই তো অসম্ভব ব্যাপার"।
সেটাই তো ভাবছি 'কিছু উদ্দেশ্য তো আছেই'।
"এই এক তোমাদের মেয়েদের দোষ উদ্দেশ্য, বিধেয় খুঁজে বেড়াও। ফোন করে ঠিকানাটা দিয়ে দাও।"
"হ্যাঁ, দাঁড়াও, দাঁড়াও একটু চিন্তা করতে দেবে তো।" এই বলে বাড়ির ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিলাম মালবিকা দিকে। আমিও সকালে বাজারের ফিরিস্তি ধরিয়ে দিলাম কর্তা মশায়ের হাতে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলাম মালবিকা দি কখন আসে। বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর আমি ফোন করলাম মালবিকা দিকে। অপর প্রান্ত থেকে মালবিকা দি বলে উঠলো, "আজ আমার এক কলেজের বন্ধুর সাথে তোর সাথে কথা হওয়ার পরই যোগাযোগ হলো । আজকে আমি ওর কাছে থেকে যাচ্ছি। তোর বাড়ির বেশ কাছাকাছি থাকে । একদিন ওখান থেকে তোর সাথে দেখা করতে যাবো"।
আমি খানিকটা গুম হয়ে বসে থেকে ফোনটা কেটে দিলাম। বুঝলাম আজকের দিনটা নিষ্ফলা কাটবে। বাজার থেকে এসে আমার মুখের অবস্থা দেখে কর্তামশায়ের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, কিছুতো একটা হয়েছে। বেশ খানিকক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করাতে আমার কাছে সব শোনার পর বললেন "চলো আজকে আমরা বাড়িতে থাকবো না। দুজনে বেড়িয়ে পড়বো। গাড়ি নিয়ে যেখানে মন চায়।" সত্যি সত্যি আধঘন্টার মধ্যে রেডি হয়ে দুজনে রওনা দিলাম । সারাদিনটা দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে কাটিয়ে , খাওয়া-দাওয়া, কেনাকাটা করে রাত্রে বাড়ি ফিরে এলাম। মায়ের মন্দিরে যেতে পেরে ভাবছিলাম, যাক আজকের দিনটা সত্যি খুব ভালো কাটালাম। মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক।
সবকিছু যেন বিধাতা নিয়ন্ত্রণ করছেন। যা হওয়ার তা হবেই। মায়ের যখন ইচ্ছে হবে তখন ঠিক তার কাছে আমরা পৌঁছে যাবো সব রকম বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে।
বেশ কয়েক মাস আগের ঘটনা আজ শেয়ার করলাম।
✍️ মন্দিরা সিনহা
Comments
Post a Comment