তিন বোনের গল্প
বন্দনা, চন্দনা, সুমনা তিন বোন। তিনজন- ই দেখতে শুনতে বেশ ভালই ছিল ।বাবা যেহেতু সরকারি চাকরি করতেন কাজেই সরকারি স্কুল থেকেই তিনজনের পড়াশোনা। পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে বেশ সখ্যতা ছিল এই তিন বোনের। খেলা ,পড়াশোনা , বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারা সবকিছুই চলতো। তাদের মধ্যে মেজ বোন চন্দনা ছিল খুব ডানপিটে। বাইরে থেকে যা কিছু অভিযোগ অনুযোগ আসতো সবই চন্দনা কে কেন্দ্র করে। যতই বাবার কাছে মার খাক না কেন তাতে চন্দনার কোন হেলদোল ছিল না। মাথায় সব সময় দুষ্টু বুদ্ধিতে ঠাসা ছিল চন্দনার। আর দুই মেয়েকে নিয়ে নেপাল বাবুর কোন দুশ্চিন্তা ছিল না ।একমাত্র চন্দনা পড়াশোনার সাথে সাথে খেলাধুলা বন্ধুদের সাথে সমান তালে মারপিট করা, মুখে মুখে তর্ক করা কোন কিছুতেই কমতি ছিল না। বন্দনা ও সুমনা লুডু, চাইনিজ চেকার, ক্যারাম খেলতো। কিন্তু চন্দনা এসব খেলার থেকে ডাঙ্গুলি, গুলি ,খো খো এসব খেলাতে বেশি সাবলীল ছিল। কাজেই চন্দনার ছেলে বন্ধু ছিল বেশি। এত ছেলে বন্ধু থাকলেও নেপালবাবু কখনো তা নিয়ে দুশ্চিন্ত করতেন না। কিন্তু নেপাল বাবুর স্ত্রী নমিতা দেবীকে পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে এই নিয়ে পাঁচ কথা শুনতে হতো। কাজেই সব রাগ গিয়ে উনার চন্দনার উপর পড়তো। কিন্তু নেপালবাবু সবসময় চন্দনার হয়ে কথা বলতেন। নমিতা দেবী এতে বিরক্ত হতেন এবং বলতেন এই মেয়েকে নিয়ে তোমাকে একদিন ভুগতে হবে।
বন্দনা বড় হওয়ার জন্য পড়াশোনা চলতে চলতেই সম্বন্ধ দেখা শুরু হয়। পড়াশোনা চলাকালীন নেপালবাবু বন্দনা কে সুপাত্রস্থ করেন।
চন্দনা পড়াশোনা করতে করতে একটি ছেলের সাথে ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়ে, একথা নেপাল বাবুর কানে যখন পৌঁছায় তখন উনি প্রথমটা চন্দনাকে বকাবকি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারলেন যে অভি মা-বাবার একমাত্র ছেলে এবং দুই মেয়ের অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেছে। মেয়েদের মধ্যে একজন গুজরাট একজন কানাডায় বসবাস করে। অভি একটি ব্যবসার সাথে যুক্ত, বাবা, কাকা, ছেলের মা এবং ছেলে একসাথে বাস করে নিজেদের বাড়িতে । বাবা ,কাকা দুজনই সরকারি চাকুরে এবং কাকা বিয়ে করেননি তখন নেপালবাবু অভির সাথে চন্দনার মেলামেশা করাটা মেনে নেন ।
অভির বাড়ির লোকজন যখন এই কথা জানতে পারেন তখন অভির মা একেবারেই রাজি ছিলেন না চন্দনার সাথে একমাত্র ছেলের বিয়ে দিতে। কারণ ওনারা ছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারের আর চন্দনারা ছিল কায়স্থ। কিন্তু বিধির লিখন কে খন্ডাতে পারে। যথা সময় চন্দনার সাথে অভির বিয়ে হয়ে যায়। যে চন্দনা এত ডানপিটে মেয়ে ছিল সে শাশুড়ির মুখের উপরে কোন কথা বলতে পারতো না। বরং শাশুড়ি মা হাজার কথা শোনালেও প্রথম প্রথম চন্দনা মুখ বুঁজে সবকিছু সহ্য করতো, শাশুড়ি মাকে সবসময় তোয়াজ করার চেষ্টা করতো । এতে শাশুড়ি মা ধীরে ধীরে চন্দনার প্রতি মন গলে যায়। চন্দনা সংসারের চাবিকাঠি বুদ্ধি বলে খুব তাড়াতাড়ি নিজের হাতে তুলে নেয় ।
উত্স: গুগল
কিন্তু সংসারের চাবিকাঠি চন্দনার হাতে চলে যাওয়ার পর শাশুড়ি মা অনেকটাই চন্দনা কে বিশ্বাস করে তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু চন্দনা উনার এই বিশ্বাসের অমর্যাদা করে। চন্দনা শাশুড়ি মাকে নানান রকম ছল চাতুরী করে কথা শোনাতে এবং ছেলের সাথে দূরত্ব তৈরি করতে থাকে। অতি সামান্য কারণে বিভিন্ন বিষয়ে ছেলের সাথে মায়ের বচসা চলতে থাকে, এমনকি চন্দনার শাশুড়ির সাথে শ্বশুর মশায়ের দূরত্ব তৈরি হয় ছেলেকে কেন্দ্র করে। এতে মনের দিক থেকে চন্দনার শাশুড়ি মা ভীষণ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বুঝতে পারেন সংসারে ওনার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। এখন সবাই চন্দনার উপরই বেশি নির্ভরশীল। মেয়েরা বিবাহ সূত্রে বহু দূরে থাকার জন্য মেয়েদেরও সব কথা খুলে বলতে পারতেন না। এমতাবস্থায় বেশ কয়েক বছর কাটানোর পর উনি মানসিক ভারসাম্য হারান। কিছুদিন বাদে উনি ইহজগত ত্যাগ করেন।
তিন মেয়ের মধ্যে নমিতা দেবী ছোট মেয়েকে বেশি পছন্দ করতেন । নমিতা দেবী মনে মনে ভাবতেন সুমনা যেহেতু সবচেয়ে পড়াশোনায় ভালো সেই হেতু সুমনা চাকরি করবে এবং ছেলের মত উনাদের পাশে দাঁড়াবে। নমিতা দেবী পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনকে সেকথা সদর্পে বলতেন। কিন্তু বিধি বাম ,সুমনা উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পর শিক্ষাকতার চাকরি পেয়ে পালিয়ে বিয়ে করে। এটা নমিতা দেবীকে ভীষণভাবে দুঃখ দেয় এবং তিনি ছোট মেয়ের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বেশিদিন স্থায়ী থাকে না। সুমনা আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী দের সহায়তায় মা বাবাকে অনেক বুঝিয়ে নিজ কৃতকর্মের জন্য বারে বারে ক্ষমা চায়। এক সময় ছোট মেয়ে ও ছোট জামাইকে আদর করে উনারা কাছে টেনে নেন।
এরপর সময়ের সাথে সাথে নমিতা দেবী নাতি ,নাতনির মুখ দেখলেন। বড় মেয়ে, মেজ মেয়ে, ছোট মেয়ে সবার ঘরেই।
বড় মেয়ে বন্দনা নিজের সংসার নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকতো যে মা-বাবার কাছে কিছু সময়ের জন্য আসতো ঠিকই ,কিন্তু কোন কিছু দায়িত্ব নিয়ে মা-বাবার জন্য করে উঠতে পারতো না। চন্দনা ও সুমনা মা বাবার দেখাশোনা করতো নিয়ম করে। এখানেও চন্দনা সবসময় অন্য দুই বোনের সম্বন্ধে নানা কটুক্তি করে মা-বাবাকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করতো। একথা মা বাবার বুঝতে অসুবিধা হতো না যে, চন্দনা মিথ্যে কথা বলছে। কিন্তু উনারা নিরুত্তাপ ছিলেন চন্দনার এই ব্যবহারে।
যেহেতু চন্দনার স্বামীর ব্যবসা খুব একটা ভালো চলতো না তাই চন্দনা শাশুড়ির অবর্তমানে চতুর বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে দুই ননদকে সম্পত্তির সামান্য অংশ দিয়ে বাকি সম্পত্তি শ্বশুর এবং খুড় শ্বশুরের কাজ থেকে নিজেদের নামে লিখে নেয়। বোনদের প্রতি মা বাবার ভালোবাসা এক চুলও না কমায়, পরবর্তীকালে নিজের মা-বাবার প্রতিও চন্দনা কর্তব্যে অবহেলা করতে থাকে। নিজের শ্বশুর ও খুড়শ্বশুড়ের প্রতিও যথেষ্ট অযত্ন ও অবহেলা চলতে থাকে। যদিও তাদের পেনশনের বেশিরভাগ টাকা টাই সংসারের কাজে লাগতো। স্বামীর ব্যবসা ঠিকঠাক মতো না জমলেও চন্দনা দুই ছেলেকে সব রকম সুযোগ-সুবিধা দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। দুই ছেলেই ছিল পড়াশুনায় অত্যন্ত মেধাবী। ছেলেদের নিয়ে চন্দনার গর্বের শেষ ছিল না।
উত্স: গুগল
পরবর্তীকালে চন্দনা মা বাবার প্রতি যত্নশীল না হলেও সুমনা চাকরি করলেও মা-বাবার দিকে ছিল সজাগ দৃষ্টি। সে কথা বুঝতে নমিতা দেবী ও নেপাল বাবুর অসুবিধা হয় না। নমিতা দেবীর যার উপর ভরসা ছিল সবচেয়ে বেশি সেই ছোট মেয়ে মা বাবার প্রতি সমস্ত কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করতে থাকে নির্দ্বিধায়।
নেপাল বাবু উইল করে নিজের বাড়ি এবং অল্প যা কিছু উনার সম্পত্তি উনাদের অবর্তমানে যাতে মেয়েরা সমান ভাগ পায় তার ব্যবস্থা করেন।
তবে চন্দনার ছেলেরা পড়াশোনায় ভালো হলেও নিজের মাকে দেখে বড় হওয়ার পর প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারে কিনা তা বলা খুব মুশকিল। একথা বলে বন্দনা ও সুমনা। কারন চন্দনার কীর্তিকলাপ বন্দনা ও সুমনা খুব ভালোভাবে জানে, নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করে কিন্তু মুখে কিছু বলে না অন্য সবার কাছে। চন্দনা কে এড়িয়ে থাকতে বেশি পছন্দ করে অন্য দুই বোন।
✍️ মন্দিরা সিনহা



Comments
Post a Comment