অনাত্মীয়

 


উৎপল খুব অল্প বয়সে মাত্র ২৫ বছর বয়সে বিয়ে করে আনে নেহাকে। এত অল্প বয়সে ঠিকমত নিজের ক্যারিয়ার তৈরি না করে মা বাবার পূর্ণ সম্মতিতে সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়ে যায় নেহা ও উৎপলের। উৎপল এবং নেহার বাবা দুজনেই সরকারি চাকুরে। নেহার বাবা অবসর নিতে ৩ বছর এবং উৎপল এর বাবার অবসর নিতে আরো ৭ বছর বাকি তখন। উৎপল তার কর্মস্থলে নেহাকে নিয়ে চলে যায় বিয়ের ছ মাস বাদেই। সেখানে সংসার পাতে এবং খুব আনন্দের সঙ্গে দিনগুলো অতিবাহিত করতে থাকে। যেহেতু উৎপলের অন্যান্য বন্ধুরা তখন ও বিয়ে করেনি, তাই নেহার বাড়ি ছিল ওদের সবার আড্ডা স্থল। নেহা খুব মিশুক হওয়ার জন্য ওদের নেহাদের বাড়িতে যাতায়াত করতে কখনোই কোন অসুবিধা হতো না। ছুটির দিনে খোস মেজাজে খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়া সবই চলতো নেহাদের বাড়িতে ।অবশ্য নেহাকে কিছুই করতে হতো না ।সবই করতো উৎপল এবং তার বন্ধুবর্গ। উৎপল তাতে বেজায় খুশি হতো ।সে ছিল ভীষণ পরোপকারী এবং কর্মস্থলের আশেপাশের লোকজন উৎপল, নেহাকে ভীষণ পছন্দ করতো। কারোর আপদে বিপদে সব সময় উৎপল ছুটে যেত অকৃতদার হিসেবে। এইভাবে ছোট্ট শহরে উৎপল প্রত্যেকের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে।

দেখতে দেখতে দু-তিন বছর পর থেকে বন্ধুদের বিয়ে হতে থাকে। কিন্তু যখনই কোন বন্ধুর বিয়ে হয়ে যায় আস্তে আস্তে সে এই আড্ডা স্থল ত্যাগ করে। এমন কি তাদের সহধর্মিনী রা এই আড্ডা মারা একদমই পছন্দ করতো না ।অনেক সময় উৎপল ও নেহার সাথে দেখা হলে উৎপল এর বন্ধুরা দুঃখ প্রকাশ করতো এবং নেহাকে বলতো যেহেতু তুমি অত্যন্ত ভালো, আমরা সব সময় ভাবতাম যে এরকম একজন জীবন সাথী আমাদেরও হবে। সব - ই ভবিতব্য, সবার সবকিছুই যে জীবনে একই রকম ঘটবে সেটা ভাবা নিতান্ত ছেলে মানুষী। উৎপলের বন্ধুদের বিয়ে হতে থাকলেও তাদের সহধর্মিনীরা প্রত্যেকে নেহাকে ঈর্ষার চোখে দেখতো। স্বামীদের কাছে নেহার প্রশংসা তারা কেউই মেনে নিতে পারতো না ।কিন্তু নেহা তাদের প্রত্যেকের সাথে অত্যন্ত সহজ, সরল ভাবে মেলামেশা করতো। নেহা যেহেতু খুব বুদ্ধিমতি প্রত্যেকের মনোভাব বুঝতে কোনো অসুবিধা হতো না। কিন্তু সব সময় নিজের সারল্যটুকু বজায় রেখেই চলতো। আবার জীবনে চলার পথে বিভিন্ন রকম অসুবিধার সম্মুখীন হতে হলে তা নেহার সাথেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সহজ হতো বন্ধু পত্নীদের। কিন্তু কাজ ফুরিয়ে গেলে আবার নেহাকে নিয়ে সমালোচনা করতেও এরা পিছপা হতো না।
স্নেহা, অন্তরা, সমাপ্তি, রাখি এরা পরবর্তীকালে নেহাকে একসাথে অনুষ্ঠান বাড়িতে আড্ডা দেওয়ার সময় অকপটে স্বীকার করে ,
"তোমাকে আমরা প্রত্যেকেই বিয়ের পর একদম ভালো চোখে দেখতাম না। তোমার কোন প্রশংসাই তখন সহ্য করতে পারতাম না কিন্তু সংসার করার পর বুঝেছি যে তোমার উপমা তুমি নিজেই"।
দীর্ঘ কয়েক বছর এই ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অবহেলা সহ্য করে নেহা সেদিন বাঁধভাঙ্গা কান্নায় নিজেকে হালকা করে নেয়। নেহার ছোট্ট তিন বছরের মেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নার কারণ বারে বারে জিজ্ঞাসা করে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দেয়।
নেহা নিজেকে হালকা করে সেদিন অন্তরার বৌভাতের গল্প শোনায় সবাইকে। নেহা বলে সজলদার বিয়ে, বউভাত দুটোতেই আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল। অন্তরার বাপের বাড়ির আন্তরিকতায় আমরা ভীষণভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তারপরে বৌভাতে সজলদা উৎপলকে বলে
" ভাই ক্যাটারিং এর ব্যাপারটা তোমাকে দেখতে হবে। ৫০০ লোকের মত নিমন্ত্রিত"।
উৎপল বলে ,"এ আর এমন কি ব্যাপার ঠিক আছে দেখবো"।
বৌভাতের দিন সুন্দর করে সেজে ছোট্ট মেয়েকে সাজিয়ে নিয়ে যাই সজলদার বৌভাতে। রাত নটার সময় যখন মেয়েকে খাওয়াবো ঠিক করি ঠিক তখনই আমাকে ডেকে উৎপল বলে ,
"খাবারে টান পড়েছে। তুমি মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে যাও"।
আমি উৎপলের এই কথার কোন উত্তর না দিয়ে মেয়েকে খাওয়ানোর উদ্যোগ শুরু করে। এদিকে বাড়ি চলে যাওয়ার কথা বলতে ছোট্ট মেয়ে উত্তরা আদো আদো ভাবে বলতে থাকে,
"মা আমরা বিয়ে বাড়িতে এসেছি, না খেয়ে চলে যাব"।
আমি বলি "তোমার পেটে ছোট্ট একটু জায়গা আমি ভরিয়ে নিয়ে যাবো সোনা। তুমি না খেলে ওদের অকল্যান হবে"।
আমার মেয়ে এই কথার মাথামুণ্ডু কি বুঝেছিল সেদিন জানিনা। কিন্তু ওকে আমি খেতে দেব একথা শুনে ও খুব খুশি হয়েছিল। তারপর ক্যাটারিং এ গিয়ে আমার মেয়ের জন্য সামান্য আয়োজন করে ওকে বসিয়ে খাইয়ে ,কোলে করে নিয়ে আমি বেরিয়ে যাই বৌভাতের অনুষ্ঠান ছেড়ে ।উৎপলের উপরে প্রচন্ড রাগ হয় সেদিন আমার।
ঠিক তার কয়েকদিনের মাথায় প্রভাত দা রাখির বাড়ির অমতে উৎপলের সহায়তায় কালীমন্দিরে বিয়ে করে আমাদের বাড়িতে চলে আসে। সেই সময় একটা যৎসামান্য ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল বৌভাতের এবং আমার সমস্ত গয়না পরিয়ে সেদিন রেখাকে রাজ রানীর মতো সাজিয়ে দিয়েছিলাম নিজের হাতে। আমাদের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাই উপস্থিত ছিল অনুষ্ঠানে।
ঠিক সেই রকম সমাপ্তির যেদিন ছেলে হলো সেদিন রাত দুটোর সময় উৎপল এর বন্ধুরা হঠাৎ করে নিচের তলায় উৎপল আমি আর আমার ছোট্ট মেয়ে শুয়ে আছি, জানলার পর্দা তুলে দিয়ে বলতে থাকে এই উৎপল শিগগিরি ওঠ ভরতের বউ এর বাচ্চা হবে। এতেও আমি প্রচন্ড চটে যাই এবং বলি,
" তোমাদের কি কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই? আমাদের কি কোন প্রাইভেসি নেই ? তোমাদের উৎপল কি ডাক্তার যে ভরতের বউয়ের বাচ্চা হবে এই জন্য উৎপলকেই যেতে হবে"।
এইভাবে জীবনে কত অজস্র ঘটনার সাথে আমরা এই কটা ফ্যামিলি জড়িয়ে আছি যা বলে শেষ করা যাবে না অল্প কথায় ।আজকে কিছুটা গল্প তোদের সাথে করে খানিকটা নিজেকে হালকা লাগছে। তোরা যে দেরীতে হলেও আমার কাছে তোদের দোষ স্বীকার করেছিস, আমি যে তোদের শুভানুধ্যায়ী ,তাতেই আমি খুশি।
কালের নিয়মে প্রত্যেকের ছেলেমেয়েরা বড় হয়। তাদের প্রত্যেকের একটা নিজস্ব জগত তৈরি হয় । তাই এখন স্নেহা ,অন্তরা ,সমাপ্তি, রাখি এবং নেহা এই পাঁচ জন নিজেদের মতো জীবনটা উপভোগ করতে পিছপা হয় না। উৎপল ও তার বন্ধুরা, এই আনন্দে শামিল হয়ে নিজেদেরকে ধন্য মনে করে। যে নেহা এত কাল অবহেলিত ছিল, এখন সেই নেহাই এদের প্রত্যেকের চোখের মণি। উৎপল,নেহা ছাড়া কোন বড় কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা এরা কেউ ভাবতেই পারে না।
এই নেহা যখন অসুস্থ হয়ে নার্সিংহোমের ভর্তি হলো তখন তার একমাত্র কন্যা সুদূর আমেরিকায় রিসার্চের কাজে ব্যস্ত। এই বন্ধুরাই নেহার পরিবারের সদস্য হয়ে উঠে। মেয়ে উত্তরা কে নেহার জন্য দুশ্চিন্তা করতে, উতলা হতে বারণ করে। এই অনাত্মীয় মানুষগুলোর উদারতা ,সহানুভূতি ও স্নেহের পরশে নেহা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। উৎপল পরের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তো ঠিকই কিন্তু নেহার ব্যাপারে ছিল ভীষণ স্পর্শ কাতর ।নেহার কিছু হলেই নার্ভাস হয়ে পড়তো। বন্ধুদের এই সহযোগিতা উৎপল ও নেহাকে মনের দিক থেকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
নিজেদের বন্ধুদের গ্রুপ যদি শক্তিশালী হয় তাহলে ছেলে মেয়েরা পড়াশোনা শিখে নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকলেও সমবয়সী বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে ,আনন্দ করে বাকি জীবনটা সুন্দর ভাবে কাটিয়ে দেওয়া যায়। আর যতদিন শরীর ভালো থাকে ততদিন সবাই মিলে মাঝে মাঝে ভ্রমণপিপাসু হয়ে বেরিয়ে পড়া তো উপরি পাওনা।
✍️
মন্দিরা সিনহা

Comments

Popular posts from this blog

মুস্কিল আসান