স্নেহ
উত্স: গুগল
ডানপিটে, ডাকাবুকো সুদীপবাবু, স্ত্রী ও দুই ছোট ছোট পুত্র সন্তান নিয়ে খুব সুখেই সংসার পেতে ছিলেন নিজের কর্মস্থল রাউরকেল্লায়। স্ত্রী ছিলেন সরকারি নার্স আর উনি চাকরি করতেন পুলিশে। প্রথমদিকে ভাড়াবাড়িতে থাকতেন, সঙ্গে ছিলেন ওনার বিধবা মা। মা সর্বক্ষণ নাতির বাবুদের আগলে রাখতেন। কারণ স্ত্রী সুনয়নার ডিউটির কোন নির্দিষ্ট সময় ছিল না। আবার সুদীপ বাবুর ও কোন ডিউটির নির্দিষ্ট সময় না থাকার জন্য ছোট ছোট ছেলেদের ভরসাস্থল ছিল তাদের ঠাকুমা।
বড় ছেলে সুমনের বয়স যখন পাঁচ বছর আর ছোট ছেলে ইমনের বয়স দুই বছর তখন তিনি নিজস্ব দোতলা বাড়ি তৈরি করেন রাউরকেল্লা শহরে। সুনয়না নিজের হাতে সুন্দর করে সেই বাড়ি গুছিয়ে তোলেন।
কিন্তু এই সুখের সংসার বেশিদিন স্থায়ী হয় না সুদীপবাবুর। হঠাৎ করেই একদিন সুনয়না সকলকে শোক সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন মাত্র 35 বছর বয়সে। চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে উনি চলে যান। সুদীপ বাবুর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সব সময় অবসাদ, দুশ্চিন্তা ওনাকে গ্রাস করতে থাকে। এর ঠিক এক মাসের মাথায় ওনার মা ও সংসারের মায়া ত্যাগ করে চলে যান অমৃত লোকে।
ছোট দুটো ছেলেকে নিয়ে সুদীপবাবু দিশেহারা অবস্থা তখন। অনেক শুভানুধ্যায়ী বন্ধু-বান্ধব পাড়া-প্রতিবেশী সুদীপ বাবুকে আবার বিয়ে করার জন্য মানসিক চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু সুদীপবাবু ছিলেন অনড়, সব সময় বলতেন এই জীবনে তিনি আর কখনোই বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন না। দিন যায় শোক কমতে থাকে এবং ছেলে দুইজনের মা-বাবা হয়ে ওঠেন তিনি। এইরকম শোকে মূহ্যমান থাকার পরও তিনি নিজে মানসিকভাবে প্রত্যয়ী ছিলেন।কারণ তিনি যে ধরনের চাকরি করতেন মনোবল ভেঙে গেলে চাকরি করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
সুমন ও ইমন ছিল সুদীপ বাবুর চোখের মণি। তাদের কি প্রয়োজন ,তাদের চাওয়া - পাওয়া সব দিকেই ছিল ওনার সজাগ দৃষ্টি । পুত্র স্নেহে উনি এতটাই অন্ধ ছিলেন ছেলেদের বিশেষ করে ছোট ছেলের সমস্ত রকম অন্যায় বায়না যথাসাধ্য মেটানোর চেষ্টা করতেন। এমনকি ছেলেরা বড় হওয়ার সাথে সাথে সামর্থ্যের বাইরে ও করার চেষ্টা করতে ত্রুটি রাখতেন না। সুমন বুঝদার হলেও ইমন ছিল অসম্ভব জেদি এবং একরোখা। কাজেই ছোট ছেলের দিকে ওনার নজর ছিল বেশি, যাতে ছেলেরা সব সময় সন্তুষ্ট থাকে ভালো থাকে এবং মায়ের কোনরকম অভাব অনুভব না করে সেটাই ছিল উনার একমাত্র লক্ষ্য। তাই কখনো কখনো অন্যায় আবদারও উনি মেনে নিতেন নির্দ্বিধায়। সময়ের সাথে সাথে দেখতে দেখতে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে সুমন কলেজে প্রবেশ করে। কলেজের পড়াশোনার শেষ করে সুমন চাকরি জীবনে প্রবেশ করে। বড় ছেলে চাকরি নিয়ে চলে আসে কলকাতায়। আর ইমন থেকে যায় বাবার কাছে। সে তখনও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি।
ইতিমধ্যে রাউরকেল্লা শহরে সুদীপবাবু আর একটা বিরাট দোতালা বাড়ি কেনেন। সুমনের পাঁচ বছর চাকরি হয়ে যাওয়ার পর সুদীপবাবু বৌমা রুপাকে ঘরে আনেন। নিজের মেয়ে না থাকার জন্য রুপা কালক্রমে ওনার মেয়ের জায়গা দখল করে নেয় অনায়াসে।
তখনও ছোট ছেলে চাকরি না হওয়ার তিনি নিজের বাড়ির তিনতলায় রেস্তোরাঁ তৈরি করেন ইমনের জন্য। এদিকে সুদীপবাবুর চাকরির মেয়াদ খুব অল্পদিন থাকার জন্য রেস্তোরাঁর সব রকম দেখভাল ছোট ছেলের সাথে উনিও করতে থাকেন। অবসর নেওয়ার পর রেস্তোরাঁর উন্নয়নের জন্য সব রকম সহায়তা উনি করেন। কয়েক বছর বাদে রেস্তোরাঁ
যখন রমরমিয়ে চলতে থাকে তখন সুদীপ বাবুর মনে আনন্দ আর ধরে না। কিন্তু ইমনের খরচের হাত ছিল লম্বা ।আয়ের তুলনায় ব্যয় হতো বেশি। এই নিয়ে সুদীপ বাবুর সাথে ছোট ছেলের মনোমালিন্য লেগেই থাকতো।
যেহেতু সুদীপবাবু টাকার অভাব কখনোই বুঝতে দেননি ছেলেদেরকে। সাধ্যের বাইরে গিয়ে উনি সমস্ত রকম চাহিদা পূরণ করেছেন। সেই জন্য ইমন সবসময় কতটা আয় হচ্ছে সেদিকে লক্ষ্য না রেখে ব্যয় করতো অত্যাধিক। যেটা অবসর গ্রহণের পর এবং একটা রেস্তোরাঁ তৈরি করে দেওয়ার পর সুদীপবাবুর উপরে ভীষণ চাপ তৈরি হতে থাকে। সুদীপবাবু ছিলেন বিচক্ষণ। তিনি রেস্তোরাঁর আয়ের অধিকাংশ টাকা অন্য জায়গায় রেখে জমিয়ে ও নিজের জমানো টাকা দিয়ে আরও ফ্ল্যাট কিনতে থাকেন। এই করে তিনি আরো দু তিনটে ফ্ল্যাট কিনে রাখেন সুমন ও ইমনের জন্য।যাতে ওনার অবর্তমানে ছেলেদের কোনরকম অসুবিধা না হয়। কারণ উনি জানতেন টাকা থাকলে ইমন সেই টাকায় হাত দেবে।
ইতিমধ্যে বড় ছেলের ঘর আলো করে আসে নাতি বাবু। সেই জন্য নাতিবাবুর টানে এক বছর মতো উনি বড় ছেলে সুমন ও বৌমা রুপার সাথে কলকাতার বাড়িতে থেকে যান। এদিকে ইমন একেবারে একা হয়ে যাওয়ায় এবং তার বাবার আওতা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে জীবন-যাপন শুরু করে। রাউরকেল্লা শহরে এইরকম একটি চালু রেস্তোরাঁর দায়িত্ব সুদীপবাবু ওনার বিশ্বস্ত ম্যানেজার উত্তমের উপর রেখে যান। এটা ইমনের অজানা ছিল। রেস্তোরাঁ কোনো টাকায় ইমন নয় ছয় করতে পারতো না এই উত্তমের জন্য। ইমন প্রচুর ক্রেডিট কার্ড ব্যাংকগুলো থেকে নেয়। বাবা রাউরকেল্লা থাকাকালীন ট্রান্সপোর্ট ব্যবসাও শুরু করেছিল ইমন। যেহেতু প্রধানত রেস্তোরাঁর দায়িত্বে থাকতেন ইমনের বাবা, তাই ইমন ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা থেকেও টাকা উপার্জন করতে থাকে। উপার্জন বেশি হলেও এক পয়সাও ইমন জমাতে পারতো না কখনো। এক বছর বাদে সুদীপবাবু ফিরে এসে ছেলেকে চিন্তা গ্রস্ত দেখেন। কারণ জানতে চাইলে ইমন ক্রেডিট কার্ডের টাকা শোধ করতে না পারার কথা সুদীপবাবুকে জানালে সুদীপবাবু রাগে ফেটে পড়েন। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে বচসা হলেও পিতৃস্নেহে তিনি যথারীতি নিজের টাকা থেকে ইমনের ক্রেডিট কার্ডের ঋণ শোধ করেন।
এরপর পুত্রবধূ রুপা শ্বশুর মশাই এর কাছ থেকে সবকিছু জানার পর ইমনের বিয়ের প্রস্তাব দেয় সুদীপবাবুর কাছে। বিয়ে দিলে ইমন অনেকটাই ঠিক হয়ে যাবে বলে রুপার ধারণা ছিল। এরপর সুদীপবাবু ইমন এর জন্য মেয়ে দেখতে থাকেন। ইমনের কোন মেয়ে পছন্দ হয় না। অবশেষে সুদীপবাবু ইমনের উপর দায়িত্ব দেন মেয়ে দেখার। ইমন বৌদি রুপাকে তার পিসতুতো বোনের কথা বলে অর্থাৎ নিপার কথা। রুপা নিজের পিসির সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে পিসির সম্মতিক্রমে শ্বশুরমশাই কে জানায় ইমন নিপাকে পছন্দ করে। যথা সময় দুই বাড়ির সম্মতিতে ইমন ও নিপার বিয়ে হয়ে যায়। সুদীপ বাবু আরো একটি কন্যাসম পুত্রবধূ নিজের বাড়ি নিয়ে আসেন। সুদীপ বাবুর সাথে নিপার সম্পর্ক ছিল বাপ -মেয়ের মতো। ছেলে ইমনের সম্বন্ধে সব রকম কথাবার্তা সুদীপবাবু নিপার সঙ্গে করতেন। এক বছরের মধ্যে ইমনকে ঠিক রাখার জন্য নিপার নামে সমস্ত সম্পত্তি লিখে দিতে হবে এটা সুদীপবাবু বুঝতে পারেন। তা না হলে ইমন টাকা পয়সা এবং সমস্ত সম্পত্তি নয় ছয় করে ফেলবে ।এই ভয়তে সুদীপবাবু নিপার নামে রেস্তোরাঁ এবং একটি ফ্ল্যাট লিখে দেন। এই নিয়ে ইমনের সঙ্গে আবার তর্কাতর্কিতে লিপ্ত হতে হয় সুদীপবাবুকে। তখনকার মতো ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে যায় ।
এই ঘটনার ৬ মাস বাদে ইমন ও নিপার ঘরেও পুত্র সন্তান আসে। সুদীপবাবু এরপর থেকে আর কোন কিছুর দেখাশোনা না করে নাতিবাবুকে নিয়ে আনন্দে মেতে থাকতেন এবং নিপা ও ইমনের উপর সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে দেন এমনকি নিজের পেনশনের টাকা তোলার দায়িত্ব ইমনকে দিয়ে দেন প্রত্যেক মাসের। ইমনের দিন দিন খরচ খরচা বাড়তে থাকে। শেয়ারবাজারে ও টাকা খাটাতে থাকে। কখনো নিপার জন্য চার পাঁচখানা শাড়ি (পঁচিশ- তিরিশ হাজার টাকার) কখনো নিজের জন্য তিন চারটে দামি ঘড়ি( ৪০-৫০ হাজার টাকা ) কখনো ছেলের জন্য দামি দামি খেলনা যেগুলো সাধ্যের বাইরে সেগুলো করতে থাকে। এইভাবে তহবিলে টান পড়তে থাকে। ইমন যখন দেখে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, বাবার পেনশনের টাকা ছাড়া ব্যাংকে আর কোন টাকা পয়সা নেই ।নিপার নামে বাবা ফ্ল্যাট এবং রেস্তোরাঁ করে দিয়েছে। বাকি ফ্ল্যাট এবং বাড়ি বাবা ও দাদার নামে রয়েছে ,তখন আর কোন কিছুই বিক্রি করতে পারেনা। ট্রান্সপোর্ট ও দেখতে দেখতে টাকা পয়সার অভাবে লাটে ওঠে, শেয়ারবাজারে বিরাট ধাক্কা খাওয়ার পর ইমন একেবারেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এই শেয়ার বাজারের কথা সুদীপবাবুর অজানা ছিল, এমনকি নিপারও। গুম হয়ে থাকে ছেলে, দেখার পরও সুদীপবাবু আর কোন কিছুই জিজ্ঞাসা করতেন না ইমন কে। যা কথা বলতেন সবই নিপার সাথে। কিছুদিন পর ইমন চিঠিতে বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। 78 বছর বয়সে সুদীপবাবু এই বিরাট ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খেতে থাকেন। বড় ছেলে সুমন তখন বাবার কাছে রুপাকে নিয়ে কলকাতা থেকে চলে আসে। দুই নাতি বাবুকে কাছে পেয়ে পুএ শোক কিছুটা হলেও নিরাময় হয় সুদীপ বাবুর। এত বড় ধাক্কা সুদীপবাবুকে মানসিক দিক থেকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিলেও ছোট নাতির মুখের দিকে চেয়ে উনি নিজেকে ঠিক রাখার চেষ্টা করতেন । চাকরির জন্য ১৫ দিন বাদে সুমন চলে গেলেও, তার কয়েক মাস পর ছেলে সহ রুপা ফিরে যায় কলকাতায় । নিপা সংসার করতে থাকে শ্বশুর মশাই এবং ছেলের নিয়ে।
স্নেহ এত বিষম বস্তু প্রথম থেকে লাগাম না ধরলে ছোট থেকে অতিরিক্ত আদরে সন্তানদের যে মানসিকতা তৈরি হয়ে যায় পরবর্তীকালে তা সামলানো মহীরুহ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
মন্দিরা সিনহা

Comments
Post a Comment